আন্তর্জাতিক ডেস্ক: এক সময় যার অপেক্ষায় গ্রাম থেকে শহর—তাতানো রোদে কিংবা অঝোর বৃষ্টিতে চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকত, সেই ডাকপিয়নের ঘণ্টা আজ আর শোনা যায় না। ডেনমার্কের ৪শ বছরের পুরনো ডাক বিভাগ বন্ধ হওয়ার ঘটনা বিশ্বজুড়ে একটি বড় প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে: ডাক সেবার ভবিষ্যৎ কী?
বিংশ শতাব্দীর আবেগ আর একবিংশ শতাব্দীর গতির লড়াইয়ে ডাক বিভাগ এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।
বর্তমান হালহকিকত: চিঠির আকাল, পার্সেলের জয়জয়কার
২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে দেখা যাচ্ছে, ব্যক্তিগত চিঠিপত্রের আদান-প্রদান বিশ্বব্যাপী প্রায় ৯৫% কমে গেছে। তবে ডাকঘরগুলো একেবারে জনশূন্য হয়ে যায়নি। ডিজিটাল বিপ্লব একদিকে যেমন চিঠি কেড়ে নিয়েছে, অন্যদিকে ই-কমার্স বা অনলাইন কেনাকাটার মাধ্যমে ডাক বিভাগের সামনে এক বিশাল সুযোগ তৈরি করেছে।
ব্যক্তিগত চিঠির বিদায়: বন্ধু বা স্বজনদের হাতে লেখা চিঠির জায়গা নিয়েছে মেসেঞ্জার বা হোয়াটসঅ্যাপ।
ই-কমার্স নির্ভরতা: আমাজন, আলিবাবা বা স্থানীয় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের কোটি কোটি পার্সেল এখন ডাক বিভাগের আয়ের প্রধান উৎস।
আর্থিক সেবা: বাংলাদেশসহ অনেক দেশে ডাকঘর এখন কেবল চিঠি নয়, বরং ব্যাংকিং ও রেমিট্যান্স সেবার একটি নির্ভরযোগ্য কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
২০২৬: প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আগামীর ডাকঘর
ভবিষ্যৎ ডাক সেবা আর কেবল পিঠে ব্যাগ ঝোলানো পিয়নের ওপর নির্ভর করবে না। ২০২৬ এবং তার পরবর্তী সময়ের ডাক সেবার সম্ভাব্য রূপ হবে অত্যন্ত উন্নত এবং স্বয়ংক্রিয়:
১. ড্রোন ও রোবটিক ডেলিভারি: দুর্গম এলাকা বা যানজটপূর্ণ শহরে পণ্য পৌঁছাতে ড্রোন এবং স্বচালিত ছোট রোবটের ব্যবহার এরই মধ্যে ডেনমার্ক, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানে শুরু হয়েছে। ২. স্মার্ট পার্সেল লকার: রাস্তার মোড়ে বা শপিং মলে বসানো থাকবে ‘স্মার্ট লকার’। গ্রাহক তার সুবিধামতো সময়ে ওটিপি (OTP) ব্যবহার করে নিজের পার্সেল নিজেই সংগ্রহ করবেন। ৩. ডিজিটাল আইডেন্টিটি: পোস্ট অফিসগুলো এখন নাগরিকদের বায়োমেট্রিক তথ্য এবং ডিজিটাল সিগনেচার বা অথেন্টিকেশনের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ৪. হাইপার-লোকাল লজিস্টিকস: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করছে আধুনিক ডাকঘরগুলো।
ডাক বিভাগের সামনে চ্যালেঞ্জ
এতকিছুর পরেও বড় চ্যালেঞ্জ হলো ব্যয় সংকোচন। ব্যক্তিগত চিঠির সংখ্যা কমে যাওয়ায় এবং লজিস্টিক খরচ বেড়ে যাওয়ায় ডেনমার্কের মতো অনেক দেশ তাদের ঐতিহ্যবাহী কাঠামো ভেঙে দিচ্ছে। বেসরকারি কুরিয়ার সার্ভিসগুলোর সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকাই এখন বড় লড়াই।
ডাক বিভাগ মরছে না, বরং তার রূপ বদলাচ্ছে। যে লাল ডাকবাক্স এক সময় বিরহের বার্তা বহন করত, সেই বাক্স হয়তো বিলুপ্ত হবে; কিন্তু তার জায়গায় আসবে হাই-টেক ডেলিভারি ড্রোন।
মানুষ হয়তো কাগজ-কলম ছেড়েছে, কিন্তু আদান-প্রদানের প্রয়োজন ছাড়েনি। তাই আগামীর ডাকঘর হবে মূলত একটি ‘ডিজিটাল লজিস্টিকস হাব’।










