Home অন্যান্য ডিজিটাল ঝড়ে অস্তিত্ব সংকটে ছাপা পত্রিকা: ভবিষ্যৎ কী?

ডিজিটাল ঝড়ে অস্তিত্ব সংকটে ছাপা পত্রিকা: ভবিষ্যৎ কী?

বিশ্বজুড়ে কমছে প্রচারসংখ্যা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
একসময় সকালের ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপের সঙ্গে হাতে খবরের কাগজ থাকাটা ছিল নিত্যদিনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু প্রযুক্তির উৎকর্ষে বদলে গেছে মানুষের খবর পড়ার ধরণ। স্মার্টফোন আর ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় বিশ্বজুড়ে অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে ঐতিহ্যবাহী মুদ্রিত সংবাদপত্র বা ছাপা পত্রিকা। আমেরিকা থেকে জাপান, কিংবা ভারত থেকে যুক্তরাজ্য—সর্বত্রই কমছে পত্রিকার সার্কুলেশন বা প্রচারসংখ্যা।

কেন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে পাঠক?
গণমাধ্যম বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক অডিট ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, ছাপা পত্রিকার পাঠক কমার পেছনে বেশ কিছু মূল কারণ রয়েছে।

প্রথমত, ডিজিটাল খবরের বিস্তার বড় ভূমিকা রাখছে। মানুষ এখন ফেসবুক, ইউটিউব ও অনলাইন নিউজপোর্টালে মুহূর্তের খবর মুহূর্তে পেয়ে যাচ্ছে। ফলে পরদিন সকালে ছাপা কাগজের ‘বাসি’ খবরের জন্য কেউ অপেক্ষা করতে চাইছে না।

দ্বিতীয়ত, দ্রুত আপডেটের অভাব। মুদ্রিত পত্রিকা দিনে মাত্র একবার প্রকাশিত হয়, যেখানে অনলাইনে প্রতি মিনিটে ব্রেকিং নিউজ আপডেট হচ্ছে। এই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না প্রিন্ট মিডিয়া।

তৃতীয়ত, খরচ বৃদ্ধি। বিশ্ববাজারে কাগজের দাম, প্রিন্টিং খরচ এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক দেশে পত্রিকার দাম বাড়াতে হয়েছে। অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে অনেক পাঠক পত্রিকা রাখা বন্ধ করে দিচ্ছেন।

চতুর্থত, প্রজন্মের অভ্যাস পরিবর্তন। বর্তমান যুবসমাজ বা ‘জেন-জি’ পত্রিকা হাতে নিয়ে পড়ার চেয়ে মোবাইলের স্ক্রিনে খবর স্ক্রল করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।

পঞ্চমত, সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব। ফেসবুক, টিকটক বা ইউটিউব এখন অনেকের কাছেই তথ্যের প্রাথমিক উৎস। ফলে আলাদা করে পত্রিকা পড়ার প্রয়োজন তারা অনুভব করছেন না।

বিশ্বের শীর্ষ পত্রিকাগুলোর প্রচারসংখ্যায় ধস
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম গবেষণার তথ্যমতে, বিশ্বের প্রভাবশালী পত্রিকাগুলোর ছাপা সংস্করণের প্রচারসংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমেছে।

যুক্তরাষ্ট্র: বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী দৈনিক ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর ছাপা সংখ্যা একসময় ১০ লাখের বেশি থাকলেও, বর্তমানে তা ৩ থেকে ৪ লাখে নেমে এসেছে। যদিও তাদের অনলাইন সাবস্ক্রিপশন এখন মূল শক্তিতে পরিণত হয়েছে। একইভাবে ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’-এর প্রচারসংখ্যা ৬-৭ লাখ থেকে কমে ২-৩ লাখে ঠেকেছে।

জাপান: বিশ্বের সবচেয়ে বড় সংবাদপত্রের বাজার বলা হতো জাপানকে। কিন্তু সেখানেও ধস নেমেছে। সর্বাধিক প্রচারিত ‘ইয়োমিউরি শিম্বুন’-এর প্রচারসংখ্যা ৯০ লাখ থেকে কমে ৬০ লাখের নিচে চলে এসেছে। আরেক জনপ্রিয় পত্রিকা ‘াসাহি শিম্বুন’ ৮০ লাখ থেকে কমে ৪০-৫০ লাখে দাঁড়িয়েছে।

যুক্তরাজ্য: বিখ্যাত ‘দ্য গার্ডিয়ান’ পত্রিকার ছাপা সংখ্যা ৩-৪ লাখ থেকে কমে এখন ১ লাখের নিচে। তারা এখন পুরোপুরি অনলাইন পাঠকের ওপর নির্ভরশীল।

ভারত: বিশ্বের সর্বাধিক প্রচারিত ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া’-র প্রচারসংখ্যা ৩০ লাখ থেকে কমে ২৫ লাখের নিচে নেমেছে। তবে পশ্চিমা বিশ্বের তুলনায় ভারতে এখনও প্রিন্ট মার্কেট কিছুটা শক্তিশালী অবস্থানে আছে।

মুদ্রিত সংবাদপত্রের ভবিষ্যৎ কী?
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মুদ্রিত সংবাদপত্রের ভবিষ্যৎ খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। উন্নত দেশগুলোতে ছাপা পত্রিকার সংখ্যা আরও দ্রুত কমবে। সেখানে অনলাইন সংস্করণই সংবাদপত্রের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে, কারণ এটি দ্রুত, সস্তা এবং বিশ্বব্যাপী পৌঁছানো সম্ভব।

তবে ভারত, বাংলাদেশ বা আফ্রিকার মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এখনই প্রিন্ট মিডিয়া হারিয়ে যাবে না। এসব দেশে বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিক এবং ইন্টারনেট সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কারণে আরও কিছু বছর ছাপা পত্রিকা টিকে থাকবে।

ভবিষ্যতে হয়তো অধিকাংশ পত্রিকা পুরোপুরি ডিজিটাল প্লাটফর্মে চলে যাবে, অথবা বিশেষ কোনো দিন বা উপলক্ষ কেন্দ্রিক সীমিত সংস্করণ ছাপানোর মডেলে টিকে থাকার চেষ্টা করবে। সংবাদপত্রের রূপ বদলাচ্ছে, আর সেই বদলের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াই এখন সংবাদশিল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

লাইক দিন 👍, শেয়ার করুন 🔁, এবং মন্তব্যে জানান আপনার মতামত!