বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পর রাষ্ট্র সংস্কারের কঠিন চ্যালেঞ্জ সামনে নিয়ে গঠিত হয়েছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব অর্পিত হয় প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, লেখক ও গবেষক ড. আ ফ ম খালিদ হোসেনের ওপর। অত্যন্ত স্বল্প মেয়াদে দায়িত্ব পালন করলেও তিনি তার সততা, নিষ্ঠা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতার মাধ্যমে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বিশেষ করে হজ ব্যবস্থাপনা সহজীকরণ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কার্যক্রমে গতিশীলতা আনয়নে তার ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়।
আগামীকাল অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রাক্কালে, ৪ হেয়ার রোডের বাসভবনে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন মুখোমুখি হয়েছিলেন এক একান্ত সাক্ষাৎকারে। যেখানে উঠে এসেছে তার মেয়াদের সফলতা, অপূর্ণতা এবং একজন আলেম হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনায় তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বয়ান। সেই আলাপচারিতার বিশেষ অংশ পাঠকদের জন্য এখানে উপস্থাপিত হলো।
প্রশ্ন: আগামীকাল নির্বাচনের পর আপনি দায়িত্ব হস্তান্তর করছেন। এই স্বল্প মেয়াদে আপনার অনুভূতি কী এবং এই বিশেষ দায়িত্বকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
ড. খালিদ হোসেন: আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহর অশেষ মেহেরবানী। একটি অত্যন্ত নাজুক ও ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে জাতি যখন পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছিল, তখন আমাদের ওপর এই গুরুদায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল। আমি মনে করি, এটি কেবল একটি পদমর্যাদা ছিল না, বরং এটি ছিল মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এবং জনগণের পক্ষ থেকে একটি পবিত্র ‘আমানত’।
আমার অনুভূতি মিশ্র। একদিকে যেমন শান্তি ও স্বস্তি অনুভব করছি যে, আমি আমার সাধ্যমতো সর্বোচ্চ সততা ও নিষ্ঠার সাথে মন্ত্রণালয়ের প্রতিটি কাজ পরিচালনা করেছি; অন্যদিকে একটু অতৃপ্তিও কাজ করছে—যদি সময় আর একটু বেশি পাওয়া যেত, তবে সংস্কারের কাজগুলো আরও গভীরে নিয়ে যেতে পারতাম। তবে আমি সন্তুষ্ট যে, আমরা একটি স্বচ্ছ এবং দুর্নীতিমুক্ত কার্যসংস্কৃতি শুরু করতে পেরেছি। ক্ষমতা আমার কাছে কখনোই ভোগবিলাস বা দাপট দেখানোর মাধ্যম ছিল না, বরং এটি ছিল আলেম সমাজের মর্যাদা রক্ষার একটি পরীক্ষা। আমি অন্তর থেকে বিশ্বাস করি, ব্যক্তি নয়—বরং নীতি ও নিষ্ঠাই একটি প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘস্থায়ী সফলতা দেয়। আমি সেই পথটি তৈরি করার চেষ্টা করেছি মাত্র।
প্রশ্ন: আপনার দৃষ্টিতে এই সময়ের সবচেয়ে বড় সফলতা কোনগুলো?
ড. খালিদ হোসেন: আমি কয়েকটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়েছিলাম:
- হজ ব্যবস্থাপনা: হজের খরচ উল্লেখযোগ্য হারে কমানো এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা সেটি করতে পেরেছি।
- সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি: দুর্গাপূজা থেকে শুরু করে অন্যান্য ধর্মীয় উৎসবে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সব ধর্মের মানুষের মধ্যে একটি আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছি।
- স্বচ্ছতা: মন্ত্রণালয়ের কাজে শতভাগ স্বচ্ছতা বজায় রেখেছি এবং দুর্নীতির কোনো সুযোগ রাখিনি।
প্রশ্ন: প্রত্যেক মানুষের কাজের কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে। আপনি নিজের কোনো ব্যর্থতা অনুভব করেন কি?
ড. খালিদ হোসেন: দেখুন, সময় খুব কম ছিল। অনেক দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারিনি। বিশেষ করে:
- মডেল মসজিদ প্রকল্প: দেশের সব মডেল মসজিদের কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি।
- ইসলামিক ফাউন্ডেশন সংস্কার: এই প্রতিষ্ঠানটিকে ঢেলে সাজানোর প্রক্রিয়া শুরু করলেও তা শেষ করে যেতে পারিনি।
- উগ্রবাদ নির্মূল: ধর্মীয় উগ্রবাদ বা ভুল ধারণা দূর করতে যে ধরনের ব্যাপক সামাজিক জাগরণ দরকার, তার মাত্র সূচনা করতে পেরেছি।
প্রশ্ন: কওমি ও আলিয়া—এই দুই ধারার মাদরাসা শিক্ষার উন্নয়নে আপনার পরিকল্পনা কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে?
ড. খালিদ হোসেন: আমি দুই ধারার আলেমদের সাথেই বসেছি। কওমি সনদের সরকারি স্বীকৃতির জটিলতা নিরসনে আমরা কাজ শুরু করেছিলাম। আলিয়া মাদরাসার সিলেবাস আধুনিকায়ন এবং স্বকীয়তা বজায় রেখে কওমি মাদরাসার উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের একটি কাঠামো দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছি। তবে শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া, যা এই স্বল্প সময়ে চূড়ান্ত করা কঠিন ছিল।
প্রশ্ন: ওয়াজ মাহফিল বা ধর্মীয় সভায় উস্কানিমূলক বক্তব্য রোধে আপনার মন্ত্রণালয় কী ভূমিকা রেখেছে?
ড. খালিদ হোসেন: আমরা জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে একটি গাইডলাইন দেওয়ার চেষ্টা করেছি যাতে ধর্মীয় সভাগুলো কোরআন-সুন্নাহর সঠিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। আমরা কোনো সেন্সরশিপ আরোপ করতে চাইনি, বরং আলেমদের বিবেককে জাগ্রত করতে চেয়েছি যাতে ইসলামের প্রকৃত শান্তি, মানবিক মূল্যবোধ, ও উদারতার বার্তা প্রচার হয়। আকাবির ও সালফে সালেহীনদের তরিকা মেনে চলতে সবাইকে আমরা উদ্বুদ্ধ করেছি।
প্রশ্ন: জাকাত বোর্ড এবং ওয়াকফ সম্পত্তি ব্যবস্থাপনায় কি কোনো পরিবর্তন আনতে পেরেছেন?
ড. খালিদ হোসেন: আমরা জাকাত বোর্ডকে আরও সক্রিয় করার উদ্যোগ নিয়েছি যাতে জাকাতের টাকা সরাসরি দারিদ্র্য বিমোচনে ব্যয় হয়। আর সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা বেদখল হওয়া ওয়াকফ সম্পত্তি উদ্ধারে একটি ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরির কাজ শুরু করেছি। কিছু বেহাত হওয়া সম্পত্তি উদ্ধার করতে সমর্থ হয়েছি। ওয়াকফ অর্ডিনেন্স অনুযায়ী একটি শক্তিশালী সুপারভাইজারি কমিটি মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার মাধ্যমে অনুমোদনের ব্যবস্থা করেছি।
প্রশ্ন: আপনার সততা প্রশ্নাতীত। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একজন আলেম হিসেবে এই ইমেজ ধরে রাখা কতটা কঠিন ছিল?
ড. খালিদ হোসেন: আমি বিশ্বাস করি, প্রতিটি কাজের হিসাব আল্লাহর কাছে দিতে হবে। লোভের কাছে আত্মসমর্পণ না করলে সততা বজায় রাখা কঠিন নয়। আমি শুধু প্রমাণের চেষ্টা করেছি যে, আলেম সমাজ দেশ পরিচালনায় স্বচ্ছতার অনন্য উদাহরণ হতে পারে।
ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন: আমি মূলত একজন শিক্ষক ও লেখক। তাই দায়িত্ব শেষে আবারও লেখালেখি আর গবেষণার জগতেই ফিরে যাব। দেশবাসীর উদ্দেশ্যে আমার বার্তা হলো—ধর্ম যেন আমাদের মাঝে কোনো দেয়াল তৈরি না করে, বরং নৈতিকতার বন্ধনকে আরও মজবুত করে। মনে রাখবেন, দেশপ্রেম ইমানের অঙ্গ; তাই আসুন সবাই মিলে প্রাণপ্রিয় এই দেশটাকে ভালোবাসি। ব্যক্তিগত তৃপ্তির জায়গা থেকে যদি বলি, কারাগারে বন্দীদের নৈতিকতা ও চরিত্র গঠনের লক্ষ্যে আমরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ১৩ হাজার ধর্মীয় বই হস্তান্তর করেছি। তাদের ইবাদতের সুবিধার্থে কার্পেট ও জায়নামাজের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি প্রতিটি কারাগারে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে পবিত্র কুরআন শিক্ষার কার্যক্রম চালু করেছি। এছাড়া মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের মাঝে সহিষ্ণুতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিবেশ বজায় রাখতে আমি সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি। সারা দেশে দুস্থ মানুষ এবং মসজিদ-মাদরাসা, এতিমখানা, মন্দির, গির্জা ও শ্মশানসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয় ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সংস্কারে আমরা সরকারি অনুদান পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছি।










