বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: আন্দামান সাগরের নীল জলরাশিতে বড় ধরনের পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা তীব্রতর হচ্ছে। মালয়েশিয়া থেকে চট্টগ্রামগামী পানামা পতাকাবাহী জাহাজ ‘SEALLOYD ARC’ ফুকেটের অদূরে ডুবে যাওয়ার পর বর্তমানে প্রায় ৪.৫ মাইল দীর্ঘ এবং ১ মাইল প্রশস্ত এলাকায় তেলের আস্তরণ (Oil Spill) ছড়িয়ে পড়েছে। থাই পরিবেশ অধিদপ্তরের সর্বশেষ বুলেটিনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
উদ্ধার অভিযান ও বর্তমান পরিস্থিতি
গত শনিবার জাহাজটি দুর্ঘটনার কবলে পড়লে থাই সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষ দ্রুত তৎপরতা চালিয়ে ১৬ জন ক্রু সদস্যকে জীবিত উদ্ধার করে। তবে জাহাজটির সঙ্গে ডুবে যাওয়া ২৯৭টি কন্টেইনারের মধ্যে ১৪টিতে বিপজ্জনক রাসায়নিক দ্রব্য থাকায় উদ্ধারকারী দল ও পরিবেশবিদদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
প্রতিরোধ ব্যবস্থা: তেলের বিস্তার রোধে বর্তমানে সাগরে বিশেষায়িত ‘বুম’ (Containment Booms) ব্যবহার করা হচ্ছে এবং হেলিকপ্টার ও ড্রোনের মাধ্যমে আকাশপথ থেকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালানো হচ্ছে।
জাহাজ শনাক্তকরণ: থাই নৌবাহিনী সমুদ্রের তলদেশে জাহাজের অবস্থান নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে যাতে সেখান থেকে অবশিষ্ট জ্বালানি তেল (Bunker Fuel) পাম্প করে সরিয়ে নেওয়া যায়।
পরিবেশগত প্রভাব ও দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞরা এই তেল নিঃসরণকে সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থানের জন্য একটি ‘টাইম বোমা’ হিসেবে দেখছেন। এর প্রধান প্রভাবগুলো হলো:
সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ধ্বংস: তেলের পুরু আস্তরণ পানির উপরিভাগে অক্সিজেনের আদান-প্রদান এবং সূর্যের আলো প্রবেশে বাধা দিচ্ছে। এতে ফাইটোপ্লাঙ্কটন ও জলজ উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে, যা পুরো সামুদ্রিক খাদ্যচক্রকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে।
কোরাল রিফের অপূরণীয় ক্ষতি: ফুকেটের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের প্রবাল প্রাচীরগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল। রাসায়নিক মিশ্রিত তেল প্রবালের সংস্পর্শে এলে ‘কোরাল ব্লিচিং’ বা প্রবালের মৃত্যু ঘটাতে পারে, যা পুনরুদ্ধার করতে কয়েক দশক সময় লাগে।
বন্যপ্রাণের প্রাণহানি: ইতিমধ্যে বেশ কিছু সামুদ্রিক কচ্ছপ ও পাখির গায়ে তেল লেগে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তেলের বিষক্রিয়ায় মাছের প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট হওয়া এবং লার্ভা মারা যাওয়ার ফলে ভবিষ্যতে মৎস্য সম্পদে টান পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
উপকূলীয় ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি: যদিও এখন পর্যন্ত তেল মূল সৈকতে পৌঁছায়নি, তবে বাতাসের গতিবেগ ও স্রোত পরিবর্তনের ফলে এটি ফুকেটের বিশ্ববিখ্যাত পর্যটন সৈকত ও পার্শ্ববর্তী ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলে আঘাত হানতে পারে। এতে থাইল্যান্ডের নীল অর্থনীতি (Blue Economy) হুমকির মুখে পড়বে।
পরবর্তী পদক্ষেপ ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
থাই নৌবাহিনী এবং পরিবেশ অধিদপ্তর যৌথভাবে তেল অপসারণ (Oil Skimming) এবং পরিবেশগত ক্ষতি নিরূপণে কাজ করে যাচ্ছে। উদ্ধারকারী দলগুলো এখন সাগরে ভাসমান কন্টেইনারগুলো সরিয়ে নৌ-পথ নিরাপদ করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
আঞ্চলিক পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো এই ঘটনার জন্য জাহাজ কোম্পানির গাফিলতি আছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছে এবং যথাযথ ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার জোর দাবি তুলেছে।