ইরানে দমন-পীড়ন সত্ত্বেও বিক্ষোভ অব্যাহত: হস্তক্ষেপের কথা ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানে দেশব্যাপী চলমান বিক্ষোভ দমনে সরকার কঠোর অবস্থান নিলেও সাধারণ মানুষ তা উপেক্ষা করে রাস্তায় নেমে এসেছে। দুই সপ্তাহ ধরে চলা এই বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশটিতে হস্তক্ষেপ করবেন কি না, তা নিয়ে ভাবনাচিন্তা করছেন।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান গত রবিবার বলেছেন, সরকার জনগণের উদ্বেগ “বসবে এবং শুনবে”, তবে একই সঙ্গে তিনি এই বিক্ষোভ উসকে দেওয়ার জন্য “দাঙ্গাকারী” এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করেছেন।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “জনগণের উদ্বেগ নিরসন করা আমাদের দায়িত্ব। কিন্তু তার চেয়ে বড় দায়িত্ব হলো একদল দাঙ্গাকারীকে পুরো সমাজ ধ্বংস করতে না দেওয়া। এরা মানুষ নয়, এরা এই দেশেরও নয়।”
অ্যাক্টিভিস্ট গ্রুপগুলোর মতে, ডিসেম্বর মাসের শেষ থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা ২০০ থেকে ৫০০ ছাড়িয়ে গেছে, যার মধ্যে কয়েক ডজন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যও রয়েছেন। এছাড়া হাজার হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট বা সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকা সত্ত্বেও রবিবার বিক্ষোভকারীরা রাজপথে অবস্থান নিয়েছেন।
এই গণবিক্ষোভ ইরানের ইসলামি শাসনের জন্য গত কয়েক বছরের মধ্যে সবথেকে বড় অভ্যন্তরীণ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসন এই বিক্ষোভের প্রতিক্রিয়ায় সামরিক পদক্ষেপের কথা বিবেচনা করছে।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে ভাবছেন এবং মঙ্গলবার ঊর্ধ্বতন উপদেষ্টাদের সঙ্গে এ বিষয়ে একটি বৈঠক নির্ধারিত রয়েছে।
ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বলেছেন, “ইরান স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখছে, যা আগে কখনো দেখেনি। যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য করতে প্রস্তুত!!!” তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের মতে, এখন পর্যন্ত ওই অঞ্চলে অতিরিক্ত কোনো সেনা বা যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হয়নি। এমনকি এই মুহূর্তে ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বিমানবাহী রণতরি (এয়ারক্রাফ্ট ক্যারিয়ার) নেই।
এদিকে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেছেন, “ইরানে হামলা হলে অধিকৃত অঞ্চল (ইসরায়েল) এবং যুক্তরাষ্ট্রের সকল ঘাঁটি ও জাহাজ আমাদের লক্ষ্যবস্তু হবে।”
বিক্ষোভের প্রেক্ষাপট মূলত অর্থনৈতিক সংকটের কারণে এই বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। তেহরানের দোকানদাররা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে দোকানপাট বন্ধ করে দিলে তা দ্রুত দেশব্যাপী সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়।
বিশ্লেষক এলি গেরানমায়েহ বলেন, “ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জন্য এটি একটি অজানা পরিস্থিতি। সমাজের যে অংশগুলো ঐতিহাসিকভাবে শাসনের মেরুদণ্ড ছিল, তারাই এখন রাস্তায় নেমেছে।”
২০২২ সালে মাহসা আমিনীর মৃত্যুর পর এটিই ইরানি শাসনের বিরুদ্ধে সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ। গত জুনে ইসরায়েলের সাথে ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরানের মুদ্রার মান ৪০ শতাংশের বেশি কমে গেছে, যা মুদ্রাস্ফীতিকে আকাশচুম্বী করেছে।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন এই দমন-পীড়নের নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, “যারা এই দমনের জন্য দায়ী, তারা ইতিহাসের ভুল পাতায় স্থান পাবে। আমরা পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছি।”










