দেশের পোল্ট্রি ও প্রাণিসম্পদ খাতে বর্তমানে ব্রয়লার ও লেয়ার মুরগির আধিপত্য একচেটিয়া। দ্রুত মাংস ও ডিমের চাহিদা মেটাতে এসব বিদেশি জাতের ভূমিকা থাকলেও, হারিয়ে যেতে বসেছে আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্যের দেশীয় জাতগুলো। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, কেবল বাণিজ্যিক জাতের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা ও জীববৈচিত্র্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
কেন দেশীয় জাত সংরক্ষণ জরুরি?
দেশীয় গরু, ছাগল ও মুরগির জাতগুলো এদেশের আবহাওয়ায় শত শত বছর ধরে অভিযোজিত। বাণিজ্যিক জাতের তুলনায় এদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক বেশি এবং লালন-পালন খরচও কম।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা: দেশি মুরগি বা গরু সচরাচর মহামারি রোগে আক্রান্ত হয় না, যা খামারিদের লোকসানের ঝুঁকি কমায়।
পুষ্টিগুণ ও স্বাদ: দেশি মুরগি ও পশুর মাংস এবং ডিমের স্বাদ ও পুষ্টিগুণ উন্নত হওয়ায় বাজারে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
পরিবেশগত সামঞ্জস্য: জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশীয় জাতগুলো অনেক বেশি সহনশীল।
বর্তমান সংকট ও বৈচিত্র্যের অভাব
বর্তমানে দেশের পোল্ট্রি বাজারের সিংহভাগই ব্রয়লার ও লেয়ারের দখলে। এতে করে সোনালী, আসিল বা টাইগার মুরগির মতো আদি জাতগুলো আজ বিলুপ্তপ্রায়। একইভাবে গরুর ক্ষেত্রে উত্তরবঙ্গের ‘পাবনা ব্রিড’ বা চট্টগ্রামের ‘রেড চিটাগাং ক্যাটল’ (RCC) সংরক্ষণের অভাবে অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে। কেবল ব্রয়লারের ওপর নির্ভরতা বাজারের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে, বিশেষ করে যখন বিদেশি ফিড বা বাচ্চার আমদানি ব্যাহত হয়।
উত্তরণের পথ ও সুপারিশ
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং কৃষি গবেষকরা বৈচিত্র্য বৃদ্ধিতে বেশ কিছু পদক্ষেপের কথা বলছেন:
সংরক্ষণাগার স্থাপন: সরকারি উদ্যোগে জিন ব্যাংক বা ব্রিডিং ফার্ম তৈরি করে দেশীয় জাতের বিশুদ্ধতা রক্ষা করা।
খামারিদের প্রণোদনা: যারা দেশীয় জাতের বাণিজ্যিক চাষাবাদ করবেন, তাদের স্বল্প সুদে ঋণ ও কারিগরি সহায়তা প্রদান।
সঙ্কর প্রজনন নিয়ন্ত্রণ: যত্রতত্র বিদেশি জাতের সাথে প্রজনন না ঘটিয়ে নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বংশবৃদ্ধি করা।
জনসচেতনতা: ভোক্তাদের মধ্যে দেশীয় পণ্যের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে ধারণা তৈরি করা যাতে এর বাজারমূল্য সঠিক থাকে।
খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উচ্চফলনশীল জাতের প্রয়োজন আছে, তবে সেটি দেশীয় সম্পদকে বিলুপ্ত করে নয়। প্রাণিসম্পদের বৈচিত্র্য রক্ষা করা কেবল আবেগের বিষয় নয়, এটি দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার একটি মূল ভিত্তি।