আশির দশকের দাবি, ২০২৫-এর প্রস্তাব
কামরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম: বন্দরনগরী ও দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম কি কেবলই একটি সিটি করপোরেশন থাকবে, নাকি ‘নগর সরকার’ ব্যবস্থার অধীনে একটি সমন্বিত প্রশাসনিক কাঠামো পাবে? গত নভেম্বরে লন্ডনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের বৈঠকের পর এই প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এসেছে। দীর্ঘ ১৭ বছর পর অনুষ্ঠিত দুই নেতার এই বৈঠকে মেয়র নগরীর সেবা ব্যবস্থায় চরম সমন্বয়হীনতার চিত্র তুলে ধরে ‘নগর সরকার’ গঠনের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছেন।
সমন্বয়হীনতার দুষ্টচক্র ও বর্তমান বাস্তবতা
চট্টগ্রাম শহরের নাগরিক সেবা বর্তমানে বহুধা বিভক্ত। সিটি করপোরেশন (চসিক), চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), ওয়াসা, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি), কর্ণফুলী গ্যাস, টেলিফোন ও ট্রাফিক বিভাগ, প্রতিটি সংস্থা ভিন্ন ভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করে। এদের মধ্যে কোনো কার্যকর চেইন অব কমান্ড বা জবাবদিহিতার একক কেন্দ্র নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সমন্বয়হীনতার মাশুল দিতে হচ্ছে নগরবাসীকে। একটি সাধারণ দৃশ্য হলো, সিটি করপোরেশন হয়তো কোটি টাকা ব্যয়ে রাস্তা কার্পেটিং শেষ করল, তার সপ্তাহখানেক পরেই ওয়াসা বা পিডিবি সেই রাস্তা খুঁড়ে পাইপ বা তার বসাচ্ছে। এতে অর্থের অপচয় যেমন হয়, তেমনি জনদুর্ভোগ বাড়ে। জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএ এবং চসিকের ঠেলাঠেলি বা দোষ চাপানোর সংস্কৃতিও নগরবাসী দীর্ঘদিন ধরে দেখছে। ডা. শাহাদাত হোসেন লন্ডনের বৈঠকে ঠিক এই জায়গাটিতেই জোর দিয়েছেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, মেয়রের হাতে যদি অন্য সংস্থাগুলোর নিয়ন্ত্রণ বা তদারকির ক্ষমতা না থাকে, তবে পরিকল্পিত নগর গঠন অসম্ভব।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: ‘বিল্ড বেটার চিটাগাং’ ও আশির দশকের দাবি
নগর সরকারের ধারণাটি চট্টগ্রামে নতুন নয়। আশির দশকে চট্টগ্রামের সচেতন নাগরিক সমাজ ও বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে গঠিত ‘বিল্ড বেটার চিটাগাং’ নামের একটি ফোরাম সর্বপ্রথম এই দাবি উত্থাপন করে। তৎকালীন সময়ে অনুষ্ঠিত একাধিক সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামে তারা দেখিয়েছিলেন যে, ঔপনিবেশিক আমলের মিউনিসিপ্যাল কাঠামো দিয়ে আধুনিক মেগাসিটি পরিচালনা সম্ভব নয়।
সেই সময় থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নির্বাচনের আগে ইশতেহারে নগর সরকারের প্রতিশ্রুতি দিলেও, ক্ষমতায় যাওয়ার পর আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বা ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের অনীহার কারণে তা আর আলোর মুখ দেখেনি। আশির দশকের সেই দাবি আজ ২০২৫ সালে এসে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে।
নগর সরকারের কাঠামো ও উপযোগিতা
নগর সরকার বা ‘সিটি গভর্নমেন্ট’ ব্যবস্থা চালু হলে শহরের প্রশাসনিক চিত্রটি কেমন হতে পারে? নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, এর মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হবে:
১. একক কর্তৃত্ব: একজন নির্বাচিত মেয়র হবেন নগর সরকারের প্রধান। শহরের ভেতরে কাজ করা সব সেবা সংস্থা (ওয়াসা, সিডিএ, বিদ্যুৎ, পুলিশ-ট্রাফিক ইত্যাদি) নগর সরকারের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবে।
২. সমন্বিত উন্নয়ন: কোনো সংস্থা ইচ্ছে করলেই রাস্তা খুঁড়তে পারবে না। একটি মাস্টারপ্ল্যানের অধীনে সব সংস্থার কাজের সমন্বয় হবে এক ছাতার নিচে।
৩. জনগণের ক্ষমতায়ন: বর্তমানে সিডিএ বা ওয়াসার মতো সংস্থাগুলোর প্রধানরা অনির্বাচিত আমলা বা সরকার মনোনীত ব্যক্তি। ফলে জনগণের কাছে তাদের সরাসরি কোনো দায়বদ্ধতা থাকে না। নগর সরকার হলে মেয়রের মাধ্যমে জনগণ তাদের ভোটাধিকারের জোরে সেবার মান নিশ্চিত করতে পারবে।
৪. দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ: মন্ত্রণালয়ের লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কমবে। ঢাকার দিকে তাকিয়ে না থেকে স্থানীয় সমস্যা স্থানীয়ভাবেই দ্রুত সমাধান করা সম্ভব হবে।
আগামীর প্রত্যাশা ও চ্যালেঞ্জ
লন্ডনের কিংস্টোনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ডা. শাহাদাত হোসেন আশা প্রকাশ করেছেন যে, বিএনপি ভবিষ্যতে রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হবে। তবে এর বাস্তবায়ন সহজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন স্থানীয় সরকার আইনের বড় ধরনের সংস্কার এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
কেন্দ্রীয় সরকার সাধারণত ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ চায় না, কারণ এতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। তবে চট্টগ্রাম যেহেতু দেশের অর্থনীতির হৃদপিণ্ড, তাই একে গতানুগতিক সিটি করপোরেশন আইনের ফ্রেমে আটকে রাখলে জাতীয় অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আশির দশকে ‘বিল্ড বেটার চিটাগাং’ যে স্বপ্ন দেখেছিল, তা বাস্তবায়নের এখনই উপযুক্ত সময়। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব না থাকলে ‘বাণিজ্যিক রাজধানী’ কেবল একটি কাগুজে উপাধি হয়েই থাকবে। ডা. শাহাদাতের প্রস্তাব ও তারেক রহমানের সঙ্গে তার আলোচনা—এই দীর্ঘদিনের দাবিটি পূরণে একটি নীতিগত অগ্রগতির ইঙ্গিত বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।










