বিশেষ প্রতিবেদন
তারিক-উল-ইসলাম
বিশ্ব যখন দ্রুত নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে এগোচ্ছে, তখন কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। উন্নত দেশগুলো কয়লা ত্যাগে অঙ্গীকার স্পষ্ট করেছে, তবে বাস্তব চিত্র বলছে রূপান্তরের পথ এখনো অসম। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে জি সেভেনের প্রতিশ্রুতি, বৈশ্বিক জ্বালানি চাহিদার টানাপোড়েন এবং উন্নয়নশীল দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি।
জি সেভেন দেশগুলো এক দশকের মধ্যে অশোধিত কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধের লক্ষ্য নিয়েছে। এর মাধ্যমে তারা পরিবেশ রক্ষার জরুরি আহ্বানকে নীতিগত রূপ দিতে চায়। তবে প্রতিশ্রুতি থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে বাস্তব প্রয়োগ পিছিয়ে। জ্বালানি বিশ্লেষকেরা বলছেন, শুধু ঘোষণা নয়, বরং পরিষ্কার পরিকল্পনা, অর্থায়ন ও নিরবচ্ছিন্ন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া লক্ষ্য পূরণ সম্ভব নয়। উন্নত দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার ভূমিকা ইতিমধ্যে কমে এলেও বিশ্বব্যাপী চিত্র একেবারে ভিন্ন।
বৈশ্বিক পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, তীব্র গরম, শিল্পকারখানার উৎপাদন বৃদ্ধির চাপ এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারের নতুন রেকর্ড ঠেকাতে অনেক দেশ পুরনো কয়লা কেন্দ্র চালু রাখছে কিংবা নতুন কেন্দ্র নির্মাণের অনুমোদন দিচ্ছে। কয়লার উৎপাদন ও ব্যবহার আগের বছরগুলোর তুলনায় কিছু অঞ্চলে আরো বেড়েছে। এর অন্যতম কারণ চীন, ভারতসহ জনবহুল দেশগুলোর বাড়তি চাহিদা। ফলে বিশ্বব্যাপী কয়লা ভিত্তিক উৎপাদন কমানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
উন্নয়নশীল দেশে কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে রূপান্তরের চ্যালেঞ্জ আরও তীব্র। সেখানে কয়লা এখনো সস্তা, সহজলভ্য ও স্থিতিশীল জ্বালানি হিসেবে বিবেচিত। বহু অঞ্চলে গ্রিড ব্যবস্থাপনা দুর্বল, নবায়নযোগ্য সক্ষমতা সীমিত এবং পর্যাপ্ত সংরক্ষণ প্রযুক্তি এখনো প্রতিষ্ঠিত নয়। ফলে হঠাৎ করে কয়লা ত্যাগ করা মানে স্থানীয় শিল্প, কর্মসংস্থান ও বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হওয়া। এই কারণে এসব দেশ ধাপে ধাপে অগ্রসর হতে চায়, যা বৈশ্বিক রূপান্তরের গতি মন্থর করে।
এছাড়া বিদ্যমান কয়লা খাতের শ্রমিকদের পুনর্বাসন, পুনঃপ্রশিক্ষণ এবং ক্ষতিপূরণের বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়। খনি অঞ্চলগুলোতে কয়লা খাত শুধু একটি জ্বালানি উৎস নয়, এটি সম্পূর্ণ একটি অর্থনৈতিক ভিত্তি। এই ভিত্তি ভেঙে গেলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনে দুর্ভোগ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা আছে। তাই আন্তর্জাতিক সহায়তা ছাড়া উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তরের চাপ বাড়ানো বাস্তবসম্মত হবে না।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি জ্বালানি রূপান্তর ন্যায্য উপায়ে পরিচালিত না হয়, তবে তা পরিবেশগত লক্ষ্য অর্জনের পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তাকেও বিপন্ন করবে। বিশ্বের বড় অর্থনীতি ও উন্নত দেশগুলোর কাছে তাই স্পষ্ট প্রত্যাশা—তাদের শুধু নিজের দেশের কয়লা ত্যাগ করাই নয়, বরং উন্নয়নশীল দেশকে প্রযুক্তিগত সহায়তা, সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন ও বিনিয়োগের নিরাপত্তা দিতে হবে।
অন্যদিকে ইতিবাচক দিকও আছে। সৌর ও বায়ুশক্তির খরচ কমে আসায় অনেক দেশ বিকল্প শক্তিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। ব্যাটারি সংরক্ষণ প্রযুক্তির উন্নতির ফলে গ্রিড স্থিতিশীলতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক তহবিল ও যৌথ বিনিয়োগ প্রকল্প বৃদ্ধি পেলে কয়লা নির্ভরতা কমানোর পথ আরও উন্মুক্ত হবে। তবে এই প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে সমন্বিত উদ্যোগ, স্পষ্ট রোডম্যাপ ও বাস্তবসম্মত সময়সীমা অপরিহার্য।
বিশ্বের শক্তি ভবিষ্যৎ এখন রূপান্তরের সন্ধিক্ষণে। কয়লা ত্যাগের পথ যদিও দীর্ঘ, তবু এটি মানবস্বাস্থ্য, জলবায়ু সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য। উন্নয়নশীল দেশে চাপ নয়, বরং সমর্থন ও প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্বই এই যাত্রার মূল চালিকা শক্তি হতে পারে।









