Home অন্যান্য কারাগার থেকে ক্ষমতার শীর্ষে: যে নেতারা বদলে দিয়েছেন বিশ্ব

কারাগার থেকে ক্ষমতার শীর্ষে: যে নেতারা বদলে দিয়েছেন বিশ্ব

নেলসন মান্ডেলা
নেলসন ম্যান্ডেলা: রোবেন আইল্যান্ডের বন্দী থেকে ‘রেইনবো নেশন’-এর রূপকার

শামসুল ইসলাম

ইতিহাস সাক্ষী, এমন অনেক মহান ব্যক্তির যারা অন্ধকার প্রকোষ্ঠের চার দেয়ালের মাঝেও নিজেদের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। প্রতিকূলতার মুখেও যারা হার মানেননি, বরং কারাগারের নির্জনতাকে রূপান্তরিত করেছেন আত্মবিশ্লেষণ আর ভবিষ্যতের রোডম্যাপ তৈরির এক উর্বর ভূমিতে। জেল খেটেছেন, নির্যাতন সহ্য করেছেন, কিন্তু নিজেদের আদর্শ আর লক্ষ্যের প্রতি ছিলেন অটল।
আর ঠিক এই কারণেই, কারাগারের তালা খোলার পর তারা শুধু মুক্ত মানুষ হিসেবে নয়, আবির্ভূত হয়েছেন এমন এক শক্তিতে, যা বদলে দিয়েছে দেশ, জাতি এবং কখনও কখনও গোটা বিশ্বের গতিপথ।
বিজনেসটুডে২৪ গর্বের সাথে উপস্থাপন করছে আমাদের নতুন সিরিজ, “কারাগার থেকে ক্ষমতার শীর্ষে: যে নেতারা বদলে দিয়েছেন বিশ্ব”। এই সিরিজে আমরা তুলে ধরব সেইসব অদম্য নেতার গল্প, যারা রাজবন্দী হিসেবে কারাভোগ করেছেন কিন্তু পরবর্তীতে নিজেদের ক্যারিশমা, দূরদর্শিতা আর নেতৃত্বের গুণাবলী দিয়ে পৌঁছে গেছেন ক্ষমতার শিখরে। নেলসন ম্যান্ডেলার ২৭ বছরের কারাবাস থেকে আরও অনেকের বারবার কারাবরণ—প্রতিটি গল্পই এক একটি জীবন্ত কিংবদন্তি।
কিভাবে তারা কারাগারের একাকীত্বকে ব্যবহার করেছেন নিজেদের কৌশল সাজাতে? কিভাবে প্রতিকূল পরিবেশেও ধরে রেখেছেন জনগণের বিশ্বাস? আর কিভাবেই বা মুক্তির পর নিজেদের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়ে হয়ে উঠেছেন ইতিহাসের মহানায়ক?
এই সিরিজটি কেবল অতীতের পুনরাবৃত্তি নয়, বরং বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উদ্যোক্তা, রাজনীতিবিদ এবং স্বপ্নদ্রষ্টাদের জন্য এক অমূল্য পাঠ। এটি শেখাবে resilience, leadership এবং vision-এর প্রকৃত অর্থ। আসুন, এই অসাধারণ ব্যক্তিত্বদের জীবন থেকে আমরা অনুপ্রেরণা খুঁজি, যারা প্রমাণ করেছেন—শারীরিক মুক্তি হয়তো সীমাবদ্ধ হতে পারে, কিন্তু একটি স্বাধীন চিন্তা আর দৃঢ় প্রতিজ্ঞাকে কোনো কারাগারই আটকে রাখতে পারে না।
বিজনেসটুডে২৪-এর সাথে থাকুন, আর সাক্ষী হোন সেইসব অদম্য ইচ্ছাশক্তির গল্পের, যা বদলে দিয়েছে বিশ্ব।
নেলসন ম্যান্ডেলা: রোবেন আইল্যান্ডের বন্দী থেকে ‘রেইনবো নেশন’-এর রূপকার
ইতিহাসে খুব কম মানুষই আছেন যারা কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠকে নিজের আদর্শের বাতিঘর হিসেবে ব্যবহার করতে পেরেছেন। নেলসন ম্যান্ডেলা তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য। সাতাশ বছরের দীর্ঘ কারাবাস যাকে ভাঙতে পারেনি, বরং আরও শক্তিশালী নেতা হিসেবে গড়ে তুলেছে।
সংগ্রামের শুরু ও রাজদ্রোহের অভিযোগ
১৯৬০-এর দশকে দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ সংখ্যালঘু সরকারের বর্ণবাদী নীতির (Apartheid) বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াইয়ের ডাক দেন ম্যান্ডেলা। ১৯৬২ সালে তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং পরবর্তীতে বিখ্যাত ‘রিভোনিয়া ট্রায়ালে’ তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তার বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ ছিল—সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র এবং অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড।
কারাগারের সেই কঠিন দিনগুলো
ম্যান্ডেলার সাতাশ বছরের কারাবাসের দীর্ঘ ১৮ বছরই কেটেছে কুখ্যাত রোবেন আইল্যান্ডে
কঠোর পরিশ্রম: তাকে চুনপাথরের খনিতে পাথর ভাঙার কাজ করতে হতো, যা তার চোখের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি করেছিল।
মানসিক দৃঢ়তা: কারাগারেই তিনি আইন বিষয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যান এবং সহবন্দীদের অধিকার আদায়ে নেতৃত্ব দেন। তিনি জেলখানাকেই একটি অনানুষ্ঠানিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করেছিলেন।
রুটিন ও শৃঙ্খলা: ম্যান্ডেলা বলতেন, “কারাগার আপনাকে নিজের দিকে তাকানোর সুযোগ দেয়।” তিনি কঠোর ব্যায়াম এবং রুটিনের মাধ্যমে নিজের শরীর ও মনকে শান্ত রাখতেন।
মুক্তি এবং ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ
আন্তর্জাতিক চাপ এবং দক্ষিণ আফ্রিকার অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতার মুখে ১৯৯০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ম্যান্ডেলা মুক্তি পান। কারাগার থেকে বেরিয়ে তিনি প্রতিশোধের বদলে ‘ক্ষমা ও পুনর্মিলন’ (Reconciliation)-এর ডাক দেন।
১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি দেশটির প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন। যে শ্বেতাঙ্গ শাসকরা তাকে বন্দী করেছিল, তাদের সাথে নিয়েই তিনি গঠন করেন এক নতুন ‘রেইনবো নেশন’।
আমাদের জন্য শিক্ষা
নেতৃত্ব মানে কেবল ক্ষমতা নয়, বরং চরম প্রতিকূলতায় নিজের আদর্শে অবিচল থাকা। ম্যান্ডেলা প্রমাণ করেছেন যে, দেয়াল তুলে শরীরকে আটকে রাখা যায়, কিন্তু মানুষের স্বপ্ন আর সংকল্পকে নয়। আজকের বিজনেস লিডার বা তরুণ প্রজন্মের জন্য ম্যান্ডেলার জীবন এক বড় শিক্ষা—কীভাবে ধৈর্য ও সহনশীলতা দিয়ে অসম্ভবকে জয় করা যায়।