Home Third Lead পকেটে সিঁধ: দেয়ালের চাকচিক্যে বিষাক্ত জালিয়াতি

পকেটে সিঁধ: দেয়ালের চাকচিক্যে বিষাক্ত জালিয়াতি

সিরিজ প্রতিবেদন

আপনি কি ঘর রাঙাচ্ছেন নাকি সীসার বিষ ছড়াচ্ছেন?

শামসুল ইসলাম
একটি নতুন বাড়ি বা পুরনো ঘরকে নতুনের মতো সাজাতে আমরা রঙের ওপর ভরসা করি। কিন্তু বাজারে নামী ব্র্যান্ডের প্লাস্টিক ইমালশন বা ডিসটেম্পার কিনেও অনেক সময় দেখা যায় দেয়ালের রঙ চটে যাচ্ছে বা অদ্ভুত দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে রঙের ড্রামে বালু বা চুন মেশানো, ওজনে কম দেওয়া এবং নামী ব্র্যান্ডের খালি কৌটায় নিম্নমানের রঙ ভরে পুনরায় সিলগালা করে বিক্রি করার মতো ভয়ংকর কারসাজি।
এই ‘রঙ-জালিয়াতি’ কেবল আপনার অর্থ নষ্ট করছে না, বরং রঙে থাকা অতিরিক্ত সীসা (Lead) আপনার পরিবারের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বিজনেসটুডে২৪-এর অনুসন্ধানে রঙ বাজারের কিছু অন্ধকার দিক বেরিয়ে এসেছে।
রঙের বাজারে যেভাবে চলে ‘রঙিন’ জালিয়াতি

১. রি-প্যাকিং জালিয়াতি (Refilling Scam): অসাধু চক্র বিভিন্ন কনস্ট্রাকশন সাইট থেকে নামী ব্র্যান্ডের খালি ড্রাম ও কৌটা সংগ্রহ করে। এরপর সেই পুরনো কৌটায় নিম্নমানের লোকাল রঙ ভরে মেশিনের সাহায্যে হুবহু আসল কোম্পানির মতো সিলগালা করে দেয়। সাধারণ ক্রেতার পক্ষে সিল দেখে নকল চেনা প্রায় অসম্ভব।

২. ওজন ও পরিমাপে কারচুপি: রঙের ড্রামে সাধারণত ১৮ বা ২০ লিটার লেখা থাকে। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায় ড্রামের ভেতরে ১ থেকে ২ লিটার রঙ কম থাকে। ড্রামের তলায় বালু বা ভারি কেমিক্যাল জমিয়ে রেখে ওজন ঠিক দেখানো হয়, যাতে নাড়াচাড়া না করলে তলার ফাঁকি ধরা পড়ে না।

৩. ক্ষতিকর সীসার (Lead) আধিক্য: স্বল্পমূল্যের ও নিম্নমানের রঙে উজ্জ্বলতা বাড়াতে প্রচুর পরিমাণে সীসা ব্যবহার করা হয়। বিএসটিআই-এর মানদণ্ড অনুযায়ী রঙে সীসার পরিমাণ ৯০ পিপিএম-এর নিচে থাকার কথা থাকলেও অনেক ভেজাল রঙে এর পরিমাণ কয়েক হাজার গুণ বেশি পাওয়া যায়। এই সীসা শিশুদের মেধা বিকাশে বাধা দেয় এবং শ্বাসকষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

৪. হোয়াইট ওয়াশ বা চুনের মিশ্রণ: প্লাস্টিক ইমালশন বা দামি রঙের ঘনত্ব বাড়াতে অনেক সময় সাধারণ চক পাউডার বা চুন মিশিয়ে দেওয়া হয়। ফলে রঙ করার কয়েক মাস পরেই দেয়াল থেকে আস্তরণ খসে পড়ে এবং রঙ তার উজ্জ্বলতা হারায়।

অনুসন্ধান ও অভিযানে ধরা পড়া বাস্তব চিত্র:
রঙের এই জালিয়াতি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ভোক্তা অধিকার ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে শিউরে ওঠা তথ্য মিলেছে:
  • ভোক্তা অধিকারের অভিযান (ঢাকা ও চট্টগ্রাম): পুরান ঢাকা ও চট্টগ্রামের কদমতলী এলাকায় বেশ কিছু রঙের গুদামে অভিযানে দেখা গেছে, সেখানে নামী ব্র্যান্ডের বালতি বা ড্রাম নকল করার ডাইস ও সিল পাওয়া গেছে। সেখানে সাধারণ নীল ও সাদা রঙ মিশিয়ে নামী ব্র্যান্ডের ‘অ্যান্টি-ফাঙ্গাল’ পেইন্ট তৈরি করা হচ্ছিল।
  • বিএসটিআই-এর ল্যাব টেস্ট: সাম্প্রতিক এক পরীক্ষায় দেখা গেছে, বাজারে প্রচলিত অন্তত ২৫ শতাংশ নন-ব্র্যান্ডের এনামেল পেইন্টে সীসার পরিমাণ বিপদসীমার অনেক উপরে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম ঝুঁকি।
  • দোকানিদের কমিশন বাণিজ্য: অনেক সময় হার্ডওয়্যার দোকানের বিক্রেতারা বেশি কমিশনের আশায় ক্রেতাকে ভালো ব্র্যান্ডের বদলে নকল বা নিম্নমানের ব্র্যান্ডের রঙ কিনতে প্ররোচিত করেন।
  • রঙ কেনার সময় সচেতনতায় যা করবেন:
  • সিল ও প্যাকিং পর্যবেক্ষণ: ড্রামের ওপরের প্লাস্টিক সিলটি কি কারখানার ফিনিশিংয়ের মতো মসৃণ নাকি অমসৃণ, তা দেখুন। ড্রামের গায়ে থাকা ব্যাচ নম্বর এবং উৎপাদনের তারিখ ঘষামাজা করা কি না পরীক্ষা করুন।
  • কিউআর কোড (QR Code) স্ক্যান: বর্তমানের অধিকাংশ বড় ব্র্যান্ড তাদের ড্রামে কিউআর কোড বা বিশেষ স্ক্র্যাচ কোড দেয়। সেটি স্ক্যান করে বা এসএমএস পাঠিয়ে রঙের সত্যতা যাচাই করে নিন।
  • অনুমোদিত ডিলার থেকে ক্রয়: রাস্তার ধারের সাধারণ দোকান থেকে রঙ না কিনে ওই ব্র্যান্ডের অনুমোদিত ডিলার বা ‘কালার ব্যাংক’ থেকে রঙ কিনুন। এতে জালিয়াতির ঝুঁকি কমে যায়।
  • গন্ধ ও ঘনত্ব পরীক্ষা: ড্রাম খোলার পর যদি অস্বাভাবিক তীব্র বা ঝাঝালো গন্ধ পাওয়া যায়, তবে বুঝবেন এতে ক্ষতিকর কেমিক্যাল আছে। আসল প্লাস্টিক ইমালশন বেশ মসৃণ হয়, এতে বালু বা দানাদার ভাব থাকবে না।
রঙের ভেজাল কেবল দেয়ালের ক্ষতি করে না, এটি আপনার ফুসফুস ও ত্বকেরও ক্ষতি করে। কোনো বিক্রেতা যদি নকল রঙ গছিয়ে দেয় বা ওজনে কম দেয়, তবে প্রমাণসহ ভোক্তা অধিকারের হটলাইন ১৬১২১ নম্বরে অভিযোগ জানান।