শিপিং ডেস্ক: ২০১০ সালে নিজের প্রথম সমুদ্রযাত্রায় বের হয়ে অ্যাডভেঞ্চারের স্বপ্ন দেখেছিলেন ২১ বছর বয়সী ভারতীয় ক্যাডেট প্রলব ধিয়ানি। কিন্তু সেশেলস থেকে জানজিবার যাওয়ার পথে মাঝসমুদ্রে তাঁর সেই স্বপ্ন রূপ নেয় এক বিভীষিকায়। ইঞ্জিন বিকল হয়ে যাওয়ায় মাঝসমুদ্রে ভাসতে থাকা তাঁদের জাহাজ ‘রাক আফ্রিকানা’ দখল করে নেয় একদল সশস্ত্র সোমালি জলদস্যু। এরপরের ৩৩১ দিন ছিল মৃত্যু আর আতঙ্কের সাথে প্রলবের এক দীর্ঘ লড়াই।
বন্দুকের নলের মুখে বিভীষিকা
প্রলব জানান, জাহাজে ওঠার পর থেকেই জলদস্যুরা আতঙ্ককে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করত। একে-৪৭ রাইফেল কপালে ঠেকিয়ে নিয়মিত চালানো হতো ‘মক এক্সিকিউশন’ বা সাজানো মৃত্যুদণ্ড।
প্রলব সেই মুহূর্তের কথা স্মরণ করে বলেন, “যখন কপালের ঠিক এক ইঞ্চি দূরে রাইফেলের ঠান্ডা ব্যারেল স্পর্শ করত, শরীর অবশ হয়ে আসত। মনে হতো এই বুঝি সব শেষ হয়ে গেল।” মুক্তিপণ আদায়ের জন্য জাহাজের মালিক পক্ষকে চাপে ফেলতেই দস্যুরা এই নিষ্ঠুর পন্থা বেছে নিয়েছিল।
মানবেতর জীবনযাপন ও প্রাণহানি: দীর্ঘ ১১ মাসের বন্দিজীবনে নাবিকদের জীবন হয়ে উঠেছিল দুর্বিষহ।
খাদ্য ও পানীয়: দিনে মাত্র একবার খাবার জুটত, যা দিয়ে কাটাতে হতো পুরো ২৪ ঘণ্টা। গোসল করা ছিল অকল্পনীয় বিলাসিতা, কারণ পানযোগ্য জল ছিল যৎসামান্য।
পরিবেশ: বিদ্যুৎহীন জাহাজে অসহ্য গরমে মশা ও মাছির উপদ্রব ছিল নিত্যসঙ্গী। টয়লেটে ব্যবহারের জন্য সমুদ্রের লোনা জল বালতি ভরে টেনে আনতে হতো।
এক সহকর্মীর মৃত্যু: এই চরম মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণা সইতে না পেরে জাহাজের বাবুর্চি (কুক) একসময় খাওয়া ছেড়ে দেন এবং মুক্তির মাত্র কয়েক দিন আগে মারা যান। বিদ্যুৎ না থাকায় বাধ্য হয়েই তাঁর মরদেহ সমুদ্রে ভাসিয়ে দিতে হয়।
মুক্তি এবং নতুন জীবন
দীর্ঘ ৩৩১ দিন পর মুক্তিপণ পরিশোধ করা হলে ইতালীয় নৌবাহিনীর একটি যুদ্ধজাহাজ প্রলবসহ অন্যান্য নাবিকদের উদ্ধার করে। মুক্তির সময় প্রলবের ওজন ২৫ কেজি কমে গিয়েছিল।
বর্তমানে প্রলব তাঁর এই অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘Hijack’ নামে একটি বই লিখেছেন, যেখানে তিনি তুলে ধরেছেন আধুনিক জলদস্যুতার নির্মম চিত্র। তাঁর এই কাহিনী আজও বিশ্বজুড়ে নাবিকদের জীবনের ঝুঁকি আর সমুদ্রপথের অনিশ্চয়তার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।