আন্তর্জাতিক ডেস্ক: জার্মানির শিল্পশহর ডর্টমুন্ড এখন এক ভিন্ন সাজে সেজেছে। ধোঁয়াশাচ্ছন্ন কলকারখানার শহরের আকাশে এখন হাজার হাজার পাখা ঝাপটানোর শব্দ। শুরু হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আয়োজন— ৩৯তম আন্তর্জাতিক রেসিং পিজিয়ন ফেয়ার (IBA) ২০২৬। ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলমান এই মেলাটি ডর্টমুন্ডের বিশাল মেস হল-৪ (Messe Dortmund) প্রাঙ্গণে আয়োজিত হচ্ছে।
রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও বিশ্ব আসর
এবারের আয়োজনের বিশেষ গুরুত্ব হচ্ছে খোদ উত্তর রাইন-ওয়েস্টফালিয়ার প্রধানমন্ত্রী হেনড্রিক উস্ট (Hendrik Wüst) এই প্রদর্শনীর পৃষ্ঠপোষকতা (Patronage) করছেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে তিনি বলেন, “কবুতর পালন কেবল একটি শখ নয়, এটি একটি সংস্কৃতি যা সীমান্ত ছাড়িয়ে বিভিন্ন দেশের মানুষকে এক সুতোয় বাঁধে।” আন্তর্জাতিক কবুতর ফেডারেশন (FCI) এবং জার্মান ডিপিএ-র তত্ত্বাবধানে আয়োজিত এই মেলায় বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশ থেকে কয়েক হাজার প্রতিনিধি অংশ নিচ্ছেন।
মেলার মূল আকর্ষণ: কী আছে ভেতরে?
মেলা প্রাঙ্গণে পা রাখলে মনে হবে আপনি কোনো রাজকীয় পক্ষীশালায় প্রবেশ করেছেন। প্রদর্শনীর প্রধান আকর্ষণগুলো হলো:
ডায়মন্ড পিজিয়ন অকশন: ৭ ফেব্রুয়ারি দুপুরে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বছরের সবচেয়ে বড় নিলাম। যেখানে মাত্র ২৪টি বিশেষ জাতের ‘হাই-ক্লাস’ কবুতর তোলা হবে। ধারণা করা হচ্ছে, একেকটি কবুতরের দাম কয়েক লক্ষ ইউরো ছাড়িয়ে যাবে।
চ্যাম্পিয়নদের সম্মাননা: ‘নিউ কিম’ বা ‘আরমান্দো’র মতো কিংবদন্তি রক্তধারার উত্তরসূরি কবুতরদের এখানে প্রদর্শন করা হচ্ছে। বিশেষ করে যারা গত মৌসুমে বার্সেলোনা বা পাত্তায়া রেসে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, তাদের স্বর্ণপদক দিয়ে সম্মানিত করা হবে।
প্রযুক্তির ছোঁয়া: কবুতরের পায়ে পরানোর জন্য নতুন প্রজন্মের ‘ইলেকট্রনিক চিপ রিং’ এবং ‘অটোমেটেড ফিডিং সিস্টেম’ নজর কাড়ছে আধুনিক ব্রিডারদের।
কড়া নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিধি
সম্প্রতি ইউরোপের কিছু অংশে বার্ড ফ্লু বা এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার আশঙ্কার কারণে মেলায় প্রবেশের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি কবুতরের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্য সনদ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এমনকি মেলা প্রাঙ্গণে একটি ‘পাবলিক ভেটেরিনারি ফোরাম’ বসানো হয়েছে, যেখানে বিশ্বের নামকরা পশু চিকিৎসকরা খামারিদের পরামর্শ দিচ্ছেন।
কেন এই মেলা এত গুরুত্বপূর্ণ?
কবুতর পালকদের কাছে এটি কেবল বেচাকেনার জায়গা নয়, বরং একে বলা হয় ‘পিজিয়ন অলিম্পিয়াড’। এখানে কবুতরের সৌন্দর্য (Standard Class) এবং ওড়ার ক্ষমতা (Sport Class)—উভয় বিভাগেই বিশ্বসেরা নির্বাচন করা হয়। নেদারল্যান্ডসের বিখ্যাত ব্রিডার হেইঙ্ক আইজারক্যাম্প বলেন, “ডর্টমুন্ড আমাদের জন্য তীর্থস্থানের মতো। এখানে আমরা একে অপরের রক্তধারা (Bloodlines) বিনিময় করি এবং আগামীর রেসগুলোর জন্য পরিকল্পনা করি।”
উৎসবের সমাপ্তি
৮ ফেব্রুয়ারি একটি জমকালো ‘গালা ডিনার’ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই বিশ্ব আসরের পর্দা নামবে। তবে তার আগে ডর্টমুন্ডের আকাশ সাক্ষী হয়ে থাকবে এমন এক আভিজাত্যের, যা সাধারণ মানুষের কাছে স্রেফ ‘পাখি’ হলেও শৌখিনদের কাছে তা অমূল্য সম্পদ।