Home Second Lead স্ত্রী-সন্তানের মৃত্যুতেও মিলল না প্যারোল: প্রশাসনিক জটিলতা নাকি মানবাধিকার লঙ্ঘন?

স্ত্রী-সন্তানের মৃত্যুতেও মিলল না প্যারোল: প্রশাসনিক জটিলতা নাকি মানবাধিকার লঙ্ঘন?

ছবি সংগৃহীত
বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: স্ত্রী ও ৯ মাসের দুগ্ধপোষ্য সন্তানের মৃত্যুতে এক মুহূর্তের জন্যও প্যারোলে মুক্তি পাননি বাগেরহাট সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দাম। প্রশাসনিক জটিলতা আর আইনি ব্যাখ্যার বেড়াজালে আটকে পড়ে শেষবারের মতো পরিবারের সদস্যদের জানাজা বা দাফনে অংশ নেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন তিনি।
শেষ পর্যন্ত শনিবার রাতে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকেই স্ত্রী-সন্তানের নিথর দেহ আনা হয় বন্দি সাদ্দামকে দেখানোর জন্য, যা নিয়ে দেশজুড়ে বইছে সমালোচনার ঝড়।
৫ মিনিটের সাক্ষাৎ, বুকে জড়াতে পারেননি সন্তানকে
কারা কর্তৃপক্ষ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকে শুক্রবার রাতে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। ১১টি মামলায় বন্দি সাদ্দামকে মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য তার স্ত্রী কানিজ সুবর্ণা ও ৯ মাসের শিশুসন্তান সেজাদ হাসান নাজিফের মরদেহ দেখার সুযোগ দেওয়া হয়।
সাদ্দামের ছোট ভাই শহিদুল ইসলাম জানান, “ভাইয়া বাচ্চাকে কোলে নিতে চেয়েও পারেননি। তার শেষ আক্ষেপ ছিল—জীবিত অবস্থায় সন্তানকে কোলে নিতে পারলাম না, মরে যাওয়ার পর নিয়ে কী হবে? তিনি সন্তানের মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, ‘আমি ভালো বাবা হতে পারলাম না, আমাকে ক্ষমা করে দিও’।”
আবেদনের দায় কার?
সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তি না হওয়া নিয়ে শুরু হয়েছে কাদা ছোড়াছুড়ি। যশোরের জেলা প্রশাসক ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, যশোর জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা কারা কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো আবেদনই করা হয়নি। তবে সাদ্দামের পরিবার জানায়, তারা বাগেরহাট জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন করেছিলেন।
সাদ্দামের মামা হেমায়েত উদ্দিন বলেন, “শুক্রবার অফিস বন্ধ থাকায় আমি ডিসি (বাগেরহাট) স্যারের বাংলোয় গিয়ে আবেদন জমা দিই। কিন্তু আমাদের বলা হয় বন্দি যশোরে থাকায় বাগেরহাট থেকে প্যারোল দেওয়া সম্ভব নয়।”
এ প্রসঙ্গে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন জানান, প্যারোল নীতিমালা (২০১৬) অনুযায়ী যে জেলায় বন্দি থাকেন, সেই জেলার ম্যাজিস্ট্রেটই সিদ্ধান্ত দেন। তারা পরিবারকে যশোরে আবেদন করার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
দায় এড়াতে পারেন না জেলা প্রশাসক: মনজিল মোরশেদ
প্রশাসনিক এই ব্যাখ্যাকে নাকচ করে দিয়েছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরশেদ। তিনি বলেন, “প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে বাগেরহাট জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব ছিল আবেদনটি যশোর জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া। নিজের জেলায় বন্দি নেই বলে তিনি দায় এড়াতে পারেন না। সাধারণ মানুষ প্রশাসনের কাছেই যাবে, তারাই সমন্বয় করবে।”
মানবাধিকার কর্মীদের ক্ষোভ
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এক বিবৃতিতে এই ঘটনাকে সংবিধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে।
আসক জানায়, সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিক সমান সুরক্ষার অধিকারী। জানাজা ও দাফনে অংশ নিতে না দেওয়া অমানবিক ও অবমাননাকর আচরণের শামিল।
২০২৫ সালের এপ্রিলে গ্রেফতার হওয়া সাদ্দাম বর্তমানে ১১টি মামলায় যশোর কারাগারে রয়েছেন। গত শুক্রবার দুপুরে বাগেরহাটের সদর উপজেলা থেকে তার স্ত্রী ও সন্তানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
স্ত্রীর বাবার পরিবারের দাবি, স্বামীর কারাবাস এবং মুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে মানসিক হতাশায় ভুগছিলেন কানিজ। শনিবার রাতে জানাজা শেষে বাগেরহাটে মা ও ছেলেকে পাশাপাশি দাফন করা হয়েছে।

এ ধরণের আরও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট পেতে ভিজিট করুন www.businesstoday24.com