Home Second Lead রিকন্ডিশন্ড গাড়ি: আপনি কি আসলেও জাপানি মান পাচ্ছেন?

রিকন্ডিশন্ড গাড়ি: আপনি কি আসলেও জাপানি মান পাচ্ছেন?

সিরিজ প্রতিবেদন

পকেটে সিঁধ: ভোক্তার প্রতিদিনের লড়াই 

কামরুল হাসান

চকচকে বডির আড়ালে ইঞ্জিন জালিয়াতি 

একটি রিকন্ডিশন্ড গাড়ি কেনা অনেক বাঙালির কাছেই জীবনের অন্যতম বড় বিনিয়োগ। আমরা বিশ্বাস করি, জাপান থেকে আসা এই গাড়িগুলো হবে নতুনের মতোই নিখুঁত। কিন্তু আপনি কি জানেন, যে গাড়িটিকে আপনি ‘ফ্রেশ কন্ডিশন’ ভেবে কয়েক লাখ টাকা বেশি দিয়ে কিনছেন, তার মিটার হয়তো কয়েক হাজার কিলোমিটার পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে? এমনকি বড় ধরণের দুর্ঘটনায় দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া গাড়িকে নতুন পার্টস লাগিয়ে ‘আনটাচড’ বলে চালিয়ে দেওয়া এখন শোরুমগুলোর নিয়মিত ব্যবসা।

বিজনেসটুডে২৪-এর অনুসন্ধানে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি বাজারের কিছু অন্ধকার দিক বেরিয়ে এসেছে।

যেভাবে চলে ‘অটো’ জালিয়াতি

১. মাইলেজ বা অডোমিটার জালিয়াতি: সবচেয়ে বড় জালিয়াতি হয় মিটারে। জাপানে হয়তো গাড়িটি ১ লাখ কিলোমিটার চলেছে, কিন্তু বাংলাদেশে এনে সফটওয়্যারের মাধ্যমে তা কমিয়ে ৩০ বা ৪০ হাজার করা হয়। ফলে আপনি মনে করেন গাড়িটি খুব কম চলেছে এবং বেশি দাম দিয়ে কেনেন। এতে ইঞ্জিনের প্রকৃত অবস্থা বোঝা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

২. অকশন শিট (Auction Sheet) জালিয়াতি: জাপান থেকে গাড়ি আসার সময় একটি গ্রেড বা মান নির্ধারণ করা থাকে (যেমন ৪.৫ বা ৫)। অসাধু ডিলাররা ফটোশপের মাধ্যমে ৩ বা আর (R-Grade) গ্রেডের দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ির রিপোর্টকে বদলে ৫ গ্রেড বানিয়ে দেয়। এই ভুয়া কাগজ দেখে আপনি ভাবেন গাড়িটি একদম নতুনের মতো।

৩. বডি ও কালার কারসাজি: জাপানে বড় দুর্ঘটনায় পড়া গাড়িকে সস্তায় কিনে দেশে আনা হয়। এরপর দক্ষ মেকানিক দিয়ে সেই ডেন্ট মেরামত করে নতুন করে রঙ (Re-paint) করা হয়। ফলে বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় থাকে না যে গাড়িটি এক সময় বড় ধরণের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এই রঙ কয়েক মাস পরেই উজ্জ্বলতা হারায়।

৪. পার্টস অদলবদল ও টায়ার জালিয়াতি: গাড়িটি শোরুমে তোলার আগে অনেক সময় জাপানি অরিজিনাল ব্যাটারি, মিউজিক সিস্টেম বা ভালো টায়ার খুলে সেখানে পুরনো বা সস্তা চাইনিজ পার্টস লাগিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়া ক্ষয়ে যাওয়া টায়ারে নতুন করে বিট কেটে (Re-grooving) তা নতুন বলে চালানো হয়, যা রাস্তায় বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।

রিকন্ডিশন্ড গাড়ি কেনার সময় যা করবেন:

অরিজিনাল অকশন শিট ভেরিফাই: ডিলারের দেওয়া কাগজের ওপর নির্ভর না করে গাড়ির চেসিস নম্বর দিয়ে ইন্টারনেটে জাপানি অকশন সাইট থেকে মূল রিপোর্টটি ডাউনলোড করুন। সেখানে গাড়ির প্রকৃত মাইলেজ এবং বডিতে কোনো স্কার্চ ছিল কি না, সব লেখা থাকে।

থার্ড পার্টি ইন্সপেকশন: গাড়িটি কেনার আগে কোনো বিশ্বস্ত মেকানিক বা অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারকে সাথে নিয়ে যান। তারা গাড়ির চেসিস বা ইঞ্জিনের শব্দ শুনেই বুঝতে পারবেন এটি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিল কি না।

মিটার ও টায়ার চেক: গাড়ির ব্রেক প্যাডেল বা স্টিয়ারিং হুইল যদি খুব বেশি ক্ষয়ে যাওয়া থাকে কিন্তু মিটারে কম রিডিং দেখায়, তবে বুঝবেন মিটার পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। টায়ারের ম্যানুফ্যাকচারিং ডেট অবশ্যই দেখে নিন।

ইঞ্জিন ও ট্রান্সমিশন টেস্ট: টেস্ট ড্রাইভ দেওয়ার সময় ইঞ্জিনের শব্দ এবং গিয়ার পরিবর্তনের মসৃণতা খেয়াল করুন। ইঞ্জিন বে-র ভেতরে কোনো তেল চুইয়ে পড়ার দাগ আছে কি না তা ভালো করে পরীক্ষা করুন।

গাড়ি কেনা কেবল শখ নয়, এটি আপনার পরিবারের নিরাপত্তার প্রশ্ন। কম দামে ‘অবিশ্বাস্য অফার’ দেখে প্রলুব্ধ হবেন না। কোনো ডিলার যদি অকশন শিট দেখাতে গড়িমসি করে, তবে সেখান থেকে গাড়ি না কেনাই ভালো। বড় কোনো জালিয়াতির শিকার হলে বিআরটিএ (BRTA) বা ভোক্তা অধিকারের হটলাইন ১৬১২১ নম্বরে অভিযোগ করুন।