Home Third Lead চট্টগ্রামের অভিজাত শপিংমলে অভিযান: ব্র্যান্ডের আড়ালে দেশি পণ্য ও দামের কারসাজি

চট্টগ্রামের অভিজাত শপিংমলে অভিযান: ব্র্যান্ডের আড়ালে দেশি পণ্য ও দামের কারসাজি

অভিযান সানমার ওশেনসিটিতে
পকেটে সিঁধ: ইদবাজারের চাকচিক্যে প্রতারণার জাল 
বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: ইদের কেনাকাটায় চট্টগ্রাম নগরীর সানমার ওশান সিটি, ফিনলে সাউথ সিটি কিংবা টেরিবাজারের নামী শোরুমগুলো ক্রেতাদের প্রধান আকর্ষণ। কিন্তু এই চাকচিক্যের আড়ালেই চলছে ভোক্তাদের পকেট কাটার মহোৎসব।
গত কয়েকদিনের অভিযানে বেরিয়ে এসেছে কীভাবে দেশি পোশাককে বিদেশি বলে চালানো হচ্ছে, আর একই পোশাকে ডাবল ট্যাগ লাগিয়ে দাম বাড়ানো হচ্ছে। ভোক্তা অধিকারের অভিযানে রাজস্থান, জেন্টেল পার্ক, শৈল্পিক ও রেড আর্থের মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠানের থলের বিড়াল বেরিয়ে এসেছে।
১. ডাবল ট্যাগ ও কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি: অভিযানে দেখা গেছে, অনেক নামী প্রতিষ্ঠানে একই পোশাকে একাধিক মূল্যের ট্যাগ লাগানো হয়েছে। আগের কম দামের ট্যাগের ওপর বেশি দামের নতুন টিকার লাগিয়ে ক্রেতাদের বিভ্রান্ত করা হচ্ছে।
সম্প্রতি জেন্টেল পার্ক-এ এমন প্রমাণ পাওয়ায় তাদের ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। ইদ কালেকশনের নামে পুরনো পণ্যকে নতুন সাজে বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে।
২. দেশি পণ্য যখন ‘ইন্ডিয়ান’ বা ‘পাকিস্তানি’: টেরিবাজারের রাজস্থান-এর মতো শোরুমে দেখা গেছে, বাংলাদেশে তৈরি পাঞ্জাবিতে ভারতীয় ব্র্যান্ডের ট্যাগ লাগিয়ে দ্বিগুণ দামে বিক্রি করা হচ্ছে। আবার সানমার ওশান সিটির অ্যাঞ্জেলিক এবং ফিনলে সাউথ সিটির বিভিন্ন দোকানে পাকিস্তানি ব্র্যান্ড ‘আগানূর’ বা ‘সাদাবাহার’-এর নাম ব্যবহার করা হলেও আমদানির কোনো বৈধ নথি তারা দেখাতে পারেনি। মূলত সাধারণ দেশি থ্রি-পিসকে বিদেশি তকমা দিয়ে কয়েক হাজার টাকা বাড়তি হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
৩. অন্যের পণ্য নিজের নামে চালানো: আগ্রাবাদের জনপ্রিয় ব্র্যান্ড শৈল্পিক-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তারা অন্যের তৈরি করা পোশাক নিজেদের কারখানায় উৎপাদিত বলে চালিয়ে দিচ্ছে। এই জালিয়াতির জন্য তাদের ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এমনকি খাদিঘর-এর মতো প্রতিষ্ঠান খোলা বাজার থেকে সাধারণ লুঙ্গি কিনে নিজেদের ব্র্যান্ডের লোগো লাগিয়ে প্রিমিয়াম দামে বিক্রি করছে।
৪. প্রসাধনী ও লেন্স জালিয়াতি: কেবল পোশাকেই নয়, রূপচর্চার সামগ্রীতেও চলছে ভয়ংকর জালিয়াতি। সানমারের রেড আর্থ কসমেটিকসে পাওয়া গেছে মেয়াদোত্তীর্ণ চোখের লেন্স এবং আমদানিকারকের স্টিকারবিহীন অনুমোদনহীন বিদেশি প্রসাধনী। চোখের মতো সংবেদনশীল অঙ্গে ব্যবহারের লেন্স মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়া জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি।
সাম্প্রতিক অভিযানের জরিমানার খতিয়ান (একনজরে):
প্রতিষ্ঠানের নাম এলাকা/মার্কেট জরিমানার পরিমাণ প্রধান অভিযোগ
রাজস্থান টেরিবাজার ১,০০,০০০ টাকা দেশি পাঞ্জাবিকে ভারতীয় বলে বিক্রি।
জেন্টেল পার্ক সিঙ্গাপুর মার্কেট ৫০,০০০ টাকা ডাবল স্টিকারে দাম বাড়ানো।
রেড আর্থ সানমার ওশান সিটি ৫০,০০০ টাকা মেয়াদোত্তীর্ণ লেন্স ও অবৈধ কসমেটিকস।
শৈল্পিক সিঙ্গাপুর মার্কেট ৩০,০০০ টাকা অন্যের পণ্য নিজের নামে চালানো।
অ্যাঞ্জেলিক সানমার ওশান সিটি ২০,০০০ টাকা বিদেশি বলে দেশি কাপড় বিক্রি।
গুজাল ফিনলে সাউথ সিটি ৩০,০০০ টাকা আমদানির ভুয়া তথ্য ও নথিপত্রহীন পণ্য।
ইদবাজারে কেনাকাটায় ভোক্তার করণীয়:
ট্যাগ পরীক্ষা: পোশাকের ট্যাগটি কি আলগাভাবে লাগানো নাকি কাপড়ের সাথে সেলাই করা, তা দেখুন। ট্যাগের নিচে অন্য কোনো স্টিকার আছে কি না হাত দিয়ে পরীক্ষা করুন।
ভাউচার যাচাই: বিদেশি পণ্য দাবি করলে বিক্রেতার কাছে এলসি (LC) বা আমদানির বৈধ নথিপত্র দেখতে চান। বিক্রেতা মুখে এক কথা বললেও কাপড়ের ভেতরের ‘কেয়ার লেবেল’ (Care Label) দেখে উৎপাদনকারী দেশ নিশ্চিত হোন।
কসমেটিকসের কিউআর কোড: কসমেটিকস কেনার সময় বিএসটিআই-এর সিল এবং আমদানিকারকের তথ্য আছে কি না দেখুন। বারকোড স্ক্যান করে পণ্যের সত্যতা যাচাই করুন।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় উপ-পরিচালক মো. ফয়েজ উল্ল্যাহর নেতৃত্বে এই অভিযানগুলো নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে। বড় বড় শপিংমলের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তদারকি না থাকায় এই জালিয়াতি বাড়ছে। প্রতারিত হলে বা অস্বাভাবিক দাম চাইলে প্রমাণসহ সরাসরি ১৬১২১ নম্বরে অভিযোগ জানান।