Home ইতিহাস ও ঐতিহ্য কুড়ি বছরের নীরবতা ভেঙে লাহোরের আকাশে ফিরছে বসন্তের রঙিন ঘুড়ি

কুড়ি বছরের নীরবতা ভেঙে লাহোরের আকাশে ফিরছে বসন্তের রঙিন ঘুড়ি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: পাকিস্তানে রাভি নদীর স্রোত আর বাদশাহী মসজিদের মিনারে যখন বসন্তের হাওয়া লাগে, তখন লাহোর কেবল জাগে না—উল্লাসে ফেটে পড়ে। দীর্ঘ ২০ বছরের দীর্ঘশ্বাস আর আইনি নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে আগামী ৬, ৭ ও ৮ ফেব্রুয়ারি লাহোরের আকাশে আবারও উড়তে যাচ্ছে ‘পতঙ্গ’। পাঞ্জাব সরকারের নতুন নির্দেশনায় নিরাপত্তার চাদরে মুড়িয়ে ফিরছে ঐতিহ্যবাহী এই ‘বসন্ত’ উৎসব।
ঐতিহ্যের শিকড়ে ফেরা
বসন্ত উৎসবের মূল প্রোথিত প্রাচীন ‘বসন্ত পঞ্চমী’র মাঝে। পাঞ্জাবের সর্ষে খেতের হলুদ গালিচা আর দেবী সরস্বতীর আরাধনার মধ্য দিয়ে যার শুরু। তবে লাহোরে এই উৎসব ধর্ম-বর্ণের গণ্ডি পেরিয়ে হয়ে উঠেছিল নিখাদ পাঞ্জাবি সংস্কৃতি।
মুঘল সম্রাটদের আমল থেকে শুরু করে মহারাজা রঞ্জিত সিং-এর রাজত্বকাল পর্যন্ত লাহোর দুর্গ আর অলিগলি সেজে উঠত গাঁদা ফুলের মালায় আর হলুদ পাগড়িতে। ছাদ থেকে ছাদে কানফাটানো চিৎকার শোনা যেত— “বো কাটা!”
অন্ধকারের দুই দশক
বিগত দুই দশক লাহোরের আকাশ ছিল বিষণ্ণ ও নীরব। কাঁচের গুঁড়ো দেওয়া ধারালো সুতা (মাঞ্জা) এবং ধাতব তারের ব্যবহারে প্রাণহানির ঘটনায় নেমে এসেছিল নিষেধাজ্ঞা। উৎসবের আনন্দ রূপ নিয়েছিল শোকে। যারা শৈশব থেকে ঘুড়ি উড়িয়ে বড় হয়েছেন, তাদের কাছে বসন্ত হয়ে গিয়েছিল এক ‘প্রিয় অতীত’। আনাকলির প্রবীণ বাসিন্দা আনোয়ার বাজওয়া আবেগজড়িত কণ্ঠে বলেন:

“বসন্ত কেবল একটি দিন ছিল না, ওটা আমার অস্তিত্বের অংশ ছিল। শূন্য আকাশটা দেখে মনে হতো শৈশবের একটা টুকরো হারিয়ে ফেলেছি।”

সতর্কতা ও নতুন সম্ভাবনা
২০২৬ সালের এই প্রত্যাবর্তন ঘটছে কঠোর নিয়মের বেড়াজালে। ‘পাঞ্জাব কাইট ফ্লাইং অর্ডিন্যান্স ২০২৫’ অনুযায়ী:
শুধুমাত্র সুতি সুতা ব্যবহার করা যাবে (ধাতব বা কাঁচের প্রলেপ নিষিদ্ধ)।
ঘুড়ি ও সুতার জন্য কিউআর-কোড (QR-coded) রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক।
সর্বোচ্চ ৯ সুতার সুতলি ব্যবহার করা যাবে।
ড্রোন দিয়ে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হবে।
বসন্ত কেবল ঘুড়ি ওড়ানোর উৎসব নয়; এটি মানুষের অদম্য প্রাণশক্তির প্রতীক। কাগজের তৈরি নড়বড়ে কাঠামো নিয়ে যেভাবে একটি ঘুড়ি আকাশের বিশালতাকে ছুঁতে চায়, লাহোরও তেমনি তার বেদনা ভুলে আবারও রঙিন হতে চাইছে। ৬ ফেব্রুয়ারি যখন প্রথম ঘুড়িটি লাহোরের আকাশে ডানা মেলবে, সেটি কেবল উৎসবের শুরু হবে না; সেটি হবে এক নতুন ও নিরাপদ ভোরের জয়গান।