বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: জাতীয় পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) প্রথমবারের মতো নিজস্ব অর্থে দুটি জাহাজ কিনতে যাচ্ছে। সমুদ্রপথে দেশের বাণিজ্যিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এটি এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সংস্থাটির চেয়ারম্যান কমডোর মাহমুদুল মালেক জানিয়েছেন, নতুন দুই বাল্ক জাহাজ যুক্ত হলে বিএসসির বার্ষিক আয় অন্তত ১৫০ কোটি টাকা বাড়বে। প্রতিটি জাহাজের ধারণক্ষমতা ৫৫ থেকে ৬৬ হাজার টন, যা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক হারে পণ্য পরিবহনে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে এ উদ্যোগে বছরে অন্তত ১৫০ নাবিকের নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
একসময় বিএসসির বহরে ৩৮টি জাহাজ ছিল। কিন্তু লোকসান, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং দুর্ঘটনাজনিত কারণে তা কমতে কমতে এখন মাত্র পাঁচটিতে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে তিনটি ট্যাঙ্কার ও দুটি বাল্ক জাহাজ দিয়ে সংস্থাটি কার্যক্রম চালাচ্ছে। নতুন দুটি জাহাজ যুক্ত হলে বহরের সংখ্যা দাঁড়াবে সাতটিতে। এছাড়া আরও তিনটি জাহাজ কেনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যা চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
দুটি নতুন জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের হেলেনিক ড্রাই বাল্ক ভেঞ্চারস এলএলসি থেকে ৯৩৬ কোটি টাকায় কেনা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি চীনের নেন ইয়াং শিপইয়ার্ড থেকে জাহাজগুলো সরবরাহ করবে। এর মধ্যে একটি জাহাজের নির্মাণকাজ প্রায় ৯০ শতাংশ সম্পন্ন, অন্যটির ৬০ শতাংশ শেষ হয়েছে।
বিএসসি ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিপিং সংস্থা হিসেবে যাত্রা শুরু করে। একই বছরের জুন মাসে ‘এমভি বাংলার দূত’ নামের জাহাজ দিয়ে পণ্য পরিবহন কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথম ১০ বছরের মধ্যে সংস্থার বহরে ২৭টি জাহাজ যুক্ত হয় এবং পরবর্তীতে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৮টিতে। একসময় আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বলভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল বিএসসি।
তবে ১৯৯১ সালের পর দীর্ঘ সময় নতুন কোনো জাহাজ বহরে যুক্ত হয়নি। লোকসান, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পারায় বিএসসির কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে আসে। অবশেষে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সরকার নতুন করে ছয়টি জাহাজ সংগ্রহ করে। এর মধ্যে একটি জাহাজ দুর্ঘটনায় পড়ে বহর থেকে বাদ যায়। বর্তমানে কার্যকরভাবে পাঁচটি জাহাজ দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মেরিটাইম নীতিমালা অনুযায়ী সমুদ্র বাণিজ্যে সাধারণত ৪০ শতাংশ পণ্য পরিবহন করে দেশীয় ক্যারিয়ার, সমপরিমাণ অর্থাৎ ৪০ শতাংশ পরিবহন করে বিদেশি ক্যারিয়ার, আর অবশিষ্ট ২০ শতাংশ যৌথভাবে বহন করে দেশি ও বিদেশি ক্যারিয়ার। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা ভিন্ন। এখন বাংলাদেশি মালিকানাধীন ১০২টি জাহাজ থাকলেও চট্টগ্রাম বন্দরে এদের মাধ্যমে মাত্র ১১ শতাংশ পণ্য পরিবহন করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে বিশ্ব নৌ-বাণিজ্যে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছাতে পারছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশীয় পতাকাবাহী জাহাজের সংখ্যা বাড়াতে পারলে বৈদেশিক আয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন জাহাজগুলো যুক্ত হলে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে বিএসসি আবারও সমুদ্রপথে দেশের বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। এর মাধ্যমে শুধু অর্থনৈতিক আয় বাড়বে না, বরং নাবিকদের জন্য কর্মসংস্থান ও আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থানও শক্তিশালী হবে।










