Home চট্টগ্রাম দক্ষিণ এশিয়ার সৈকতে মৃত্যুফাঁদ: জাহাজ ভাঙা শিল্পের নগ্ন চিত্র

দক্ষিণ এশিয়ার সৈকতে মৃত্যুফাঁদ: জাহাজ ভাঙা শিল্পের নগ্ন চিত্র

পর্ব ১:

সিরিজ প্রতিবেদন: মৃত্যুর সৈকতে বিষাক্ত জাহাজ

কামরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম:  বিশালকায় লোহার কাঠামো, একসময় যা উত্তাল সমুদ্রে পণ্য নিয়ে দাপিয়ে বেড়াত, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেগুলো ঠাঁই নিচ্ছে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের কাদামাখা সৈকতে। এনজিও শিপব্রেকিং প্ল্যাটফর্মের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, সারা বিশ্বে যত জাহাজ ভাঙা হয়, তার ৮৫ শতাংশই এখন দক্ষিণ এশিয়ার এই তিনটি দেশের সৈকতে এসে জমা হচ্ছে। কিন্তু এই বিশাল ব্যবসার আড়ালে চাপা পড়ছে শ্রমিকদের আর্তনাদ আর ধ্বংস হওয়া উপকূলীয় বাস্তুসংস্থান।
পরিসংখ্যানের ভয়াবহতা
২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে মোট ৩২১টি জাহাজ ভেঙে ফেলা হয়েছে। এর মধ্যে বিশাল এক অংশ অর্থাৎ ২১৪টি জাহাজই এসেছে দক্ষিণ এশিয়ায়। জাহাজ মালিকদের কাছে সস্তায় জাহাজ ভাঙার জন্য বাংলাদেশ ও ভারত এখনও প্রথম পছন্দ। অথচ এই পছন্দের মাশুল দিচ্ছে শ্রমিকেরা তাদের জীবন দিয়ে।
 রক্তের দামে কেনা লোহা
গত এক বছরে দক্ষিণ এশিয়ার এই সৈকতগুলোতে জাহাজ ভাঙতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ১১ জন শ্রমিক। এছাড়া গুরুতর আহত হয়েছেন অন্তত ৬২ জন। প্রতিবেদন অনুযায়ী:
বাংলার জ্যোতি দুর্ঘটনা: চট্রগ্রামের জিরি সুবেদার ইয়ার্ডে বিএসসির এই তেল ট্যাংকার বিস্ফোরণে ৮ জন শ্রমিক দগ্ধ ও আহত হন।
সিপিক এশিয়া (SEAPEAK ASIA) ট্র্যাজেডি: চট্রগ্রামের কেআর শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে রাতের আঁধারে জাহাজ ভেড়ানোর (Beaching) সময় দুই শ্রমিক প্রাণ হারান। সমুদ্রের পাড়ে একজনের দেহ এবং অন্যজনের বিচ্ছিন্ন দেহাংশ পাওয়া যায়।
অনিরাপদ কর্মপরিবেশ ও তথ্য গোপন
বিস্ময়কর তথ্য হলো, বাংলাদেশে বর্তমানে ১৭টি ইয়ার্ড আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের ‘হংকং কনভেনশন (HKC)’ অনুযায়ী অনুমোদিত। নিয়ম অনুযায়ী এসব ইয়ার্ডে নিরাপত্তা অনেক বেশি থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এই অনুমোদিত ইয়ার্ডগুলোতেই বড় ধরণের দুর্ঘটনা ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ দুর্ঘটনার তথ্য গোপন রাখছে অথবা অস্পষ্ট রিপোর্ট দিচ্ছে।
 পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি
সৈকতে জাহাজ ভাঙার এই পদ্ধতিটি (Beaching) পরিবেশের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ। জাহাজের বিষাক্ত তেল, অ্যাসবেস্টস এবং অন্যান্য রাসায়নিক সরাসরি মিশে যাচ্ছে সাগরের পানিতে ও চরের মাটিতে। এতে ধ্বংস হচ্ছে উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য, যার প্রভাব পড়ছে স্থানীয় মৎস্যজীবী ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।
 বিশেষজ্ঞের সতর্কতা
এনজিও শিপব্রেকিং প্ল্যাটফর্মের নির্বাহী পরিচালক ইংভিল্ড জেনসেন বলেন, “এটি স্পষ্ট যে হংকং কনভেনশন নিরাপদ এবং পরিবেশসম্মত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারছে না। সমুদ্র সৈকতে জাহাজ ভাঙার এই ত্রুটিপূর্ণ পদ্ধতি এখনই বন্ধ করা উচিত।”
 লাভের অংক গুনতে গিয়ে জাহাজ মালিকরা দক্ষিণ এশিয়ার এই সৈকতগুলোকে বিশ্বের ‘আবর্জনার ভাগাড়’ বানিয়ে তুলছেন। যেখানে আইন আছে কিন্তু প্রয়োগ নেই, আর নিরাপত্তা আছে শুধু কাগজ-কলমে।

পরবর্তী পর্বে থাকছে: ‘হংকং কনভেনশন’ কীভাবে জাহাজ মালিকদের রক্ষা কবচ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং কেন আন্তর্জাতিক এই আইন কার্যকর হচ্ছে না।