Home Second Lead কীটনাশকের ছায়ায় পাখি, মাছ ও জীববৈচিত্র্য বিপন্ন

কীটনাশকের ছায়ায় পাখি, মাছ ও জীববৈচিত্র্য বিপন্ন

ছবি: এ আই

বিষের ছায়ায় কৃষি ও জনস্বাস্থ্য: পর্ব-৬

তারিক-উল-ইসলাম, ঢাকা: বাংলাদেশের কৃষিজমিতে ফলন বাড়ানোর লক্ষ্যে যে বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক কীটনাশক ও সার ব্যবহার করা হয়, তা শুধু মানুষের শরীরেই নয়, বরং প্রকৃতির বৈচিত্র্যময় প্রাণজগতেও নীরব বিপর্যয় ডেকে আনছে। জমিতে স্প্রে করা এসব রাসায়নিক বাতাস, পানি ও মাটির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের বাস্তুতন্ত্রে। এর প্রভাব প্রথমে বোঝা না গেলেও ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে পরিবেশের নিঃশব্দ মৃত্যু।

পাখির জনসংখ্যায় এই প্রভাব সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। গ্রামের পুকুর, গাছের ডাল বা ধানের ক্ষেতে যে সব পাখির আনাগোনা ছিল নিয়মিত, তাদের সংখ্যা এখন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। বিশেষ করে কীটনাশকে থাকা নন-টার্গেট টক্সিন পাখিদের খাদ্যচক্রে ঢুকে যায়। পোকা-মাকড় খাওয়া পাখিরা বিষাক্ত পোকা খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে, অনেক সময় মারা যায়। আবার কিছু কীটনাশক পাখির ডিমের খোলসকে দুর্বল করে দেয়, ফলে ডিম ফোটার হার কমে যাচ্ছে বিভিন্ন অঞ্চলে।

মাছের ক্ষেত্রেও সংকট ভয়াবহ। খাল-বিল বা পুকুরে জমি থেকে ধুয়ে আসা কীটনাশক পানির সঙ্গে মিশে মাছের শ্বাসকার্য বিঘ্নিত করে। অনেক মাছ পানির নিচে টিকে থাকার প্রয়োজনীয় অক্সিজেন পায় না, ফলে তাদের মৃত্যুহার বাড়ে। কিছু রাসায়নিক মাছের প্রজননক্ষমতা কমিয়ে দেয়, যার প্রভাব পড়ে স্থানীয় মৎস্যসম্পদে। একসময় যেসব খালে মাছ ধরা হতো নিয়মিত, এখন অনেক জায়গায় সেগুলো প্রায় মাছশূন্য হয়ে গেছে।

জলজ উদ্ভিদ ও ক্ষুদ্র প্রাণীদের ওপর প্রভাবও অত্যন্ত গভীর। প্ল্যাঙ্কটন, শৈবাল, ব্যাঙাচি ও নানা ক্ষুদ্র জলজ প্রাণী পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। কিন্তু পানিতে বিষাক্ত উপাদানের উপস্থিতিতে এদের মৃত্যু ঘটলে পুরো খাদ্যচক্রই ব্যাহত হয়। ফলে পুকুরের পানি সবুজ হয়ে যাওয়া, দুর্গন্ধ সৃষ্টি হওয়া কিংবা পানির স্বাভাবিক জৈব ভারসাম্য নষ্ট হওয়া—এসব ঘটনা ক্রমশ বাড়ছে।

মাটির প্রাণবৈচিত্র্যও ঝুঁকিতে। কেঁচো, উপকারী ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক মাটির উর্বরতা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু নিয়মিত স্প্রে করা বালাইনাশকের কারণে এসব উপকারী প্রাণীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। কেঁচোর সংখ্যা কমে গেলে মাটি ঝুরঝুরে থাকে না, পানি ধারণক্ষমতা কমে, ফলনেও প্রভাব পড়ে। জমি উর্বর রাখতে কৃষককে আরও বেশি সার ব্যবহার করতে হয়, যা আবার নতুন দূষণ তৈরি করে এক প্রকার দুষ্টচক্রের জন্ম দেয়।

বিজ্ঞানীরা এই পরিস্থিতিকে পরিবেশগত সতর্ক সংকেত বলে মনে করছেন। জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হলে কৃষিও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কারণ প্রকৃতিই কৃষির ভিত্তি। পাখি পোকা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে, মাছ পানি বিশুদ্ধ করে, কেঁচো মাটিকে উর্বর করে—এই সমন্বিত প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া ভেঙে পড়লে কৃষি ব্যবস্থাও অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে।

পরিবেশবিদরা বলছেন, এখনই যদি রাসায়নিক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা না হয় এবং বিকল্প পরিবেশবান্ধব সমাধানের দিকে যাওয়া না হয়, তবে ভবিষ্যতে দেশে অনেক প্রজাতি বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। স্থানীয় প্রশাসন, কৃষি দপ্তর ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে, যাতে জমি থেকে পানি ও পরিবেশে রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়া কমানো যায়।

জীববৈচিত্র্য হারালে শুধু পরিবেশেরই ক্ষতি হয় না, তা মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা থেকে শুরু করে অর্থনীতি পর্যন্ত সবকিছুতেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই নীরব বিপর্যয় থামাতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপের দাবি উঠছে বিভিন্ন মহলে।

পরবর্তী পর্বে থাকছে
বাজারে নকল ও নিষিদ্ধ কীটনাশকের ছড়াছড়ি: নিয়ন্ত্রণহীন একটি ঝুঁকিপূর্ণ বাজার