Home বিশেষ প্রতিবেদন একটি ভাঙা পেন্সিল ও হারানো হাসির গল্প: বুলিং যখন দুঃস্বপ্ন

একটি ভাঙা পেন্সিল ও হারানো হাসির গল্প: বুলিং যখন দুঃস্বপ্ন

ফিচার

স্মৃতি হাসান: 
একাদশ শ্রেণীর ছাত্র আবীর। শান্ত স্বভাবের ছেলেটি ছবি আঁকতে ভালোবাসে। ক্লাসের এক কোণে বসে যখন সে স্কেচবুকে নীল আকাশ আঁকত, তখন হয়তো সে জানত না যে তার বাস্তবের আকাশটা খুব দ্রুতই মেঘাচ্ছন্ন হতে চলেছে।
আবীর কিছুটা তোতলা। ক্লাসে পড়ার সময় যখন সে একটু আটকে যেত, পেছন থেকে সহপাঠীদের হাসাহাসি শুরু হতো। প্রথমে একে ‘দুষ্টুমি’ মনে হলেও ধীরে ধীরে তা বিষাক্ত রূপ নেয়। ক্লাসের এক প্রভাবশালী ছাত্রের নেতৃত্বে একদল ছেলে আবীরকে ‘তোতলা পেন্সিল’ নামে ডাকা শুরু করল।
প্রতিদিন টিফিন পিরিয়ডে তার ব্যাগ লুকিয়ে রাখা, তার আঁকার খাতা ছিঁড়ে ফেলা আর কথায় কথায় গায়ে হাত তোলা—এগুলো যেন তাদের নিয়মিত রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আবীর কাউকে বলতে পারছিল না; কারণ তাকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল যে, বাড়িতে বললে তার বিপদ আরও বাড়বে।
পরিণতির নীল দংশন: কয়েক মাস পর দেখা গেল এক চনমনে আবীর ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। তার পড়াশোনায় মন নেই, রেজাল্ট খারাপ হচ্ছে এবং কোনো কারণ ছাড়াই সে স্কুল কামাই করতে শুরু করল। প্রতিদিন সকালে স্কুল ইউনিফর্ম পরার সময় তার হাত কাঁপত। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটি কেবল ভয় নয়, এটি ছিল তীব্র মানসিক ট্রমা বা ট্রমাটিক স্ট্রেস।
এক রাতে আবীরের মা লক্ষ্য করলেন, ঘুমের ঘোরে আবীর চিৎকার করে বলছে, “প্লিজ, আমার খাতাটা ফেরত দাও, আমাকে মেরো না!” এভাবেই বুলিং একজন কিশোরের আত্মবিশ্বাস চুরমার করে তাকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়।
ফিচারের আলোকে বিশ্লেষণ: কেন এটি সামাজিক ব্যাধি?
আবীরের এই গল্পটি কাল্পনিক হলেও আমাদের দেশের হাজারো শিক্ষার্থীর বাস্তব চিত্র। বুলিং-এর পরিণতি কেন এত ভয়াবহ হতে পারে, তার কিছু তথ্য নিচে দেওয়া হলো:
১. মানসিক স্বাস্থ্যের ধস: বুলিং-এর শিকার শিক্ষার্থীরা দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্নতা (Depression) এবং ফোবিয়ায় ভোগে। অনেক ক্ষেত্রে এই ক্ষত সারাতে বছরের পর বছর সময় লাগে।
২. একাডেমি ক্যারিয়ার ধ্বংস: মেধাবী শিক্ষার্থীরাও বুলিং-এর কারণে পড়ালেখা ছেড়ে দেয় বা স্কুল থেকে ঝরে পড়ে (Drop out)। এটি কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, জাতীয় মেধার অপচয়।
৩. বুলিংকারী যখন ভবিষ্যতের অপরাধী: গবেষণা বলছে, যারা ছোটবেলায় বুলিং করে এবং কোনো বাধা পায় না, তাদের মধ্যে ভবিষ্যতে বড় ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বেশি থাকে।
৪. চরম ট্র্যাজেডি: বুলিং-এর যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে অনেক শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়, যা একটি পরিবারের জন্য চিরস্থায়ী অন্ধকার বয়ে আনে।
মুক্তির পথ কী?
আবীরের বাবা-মা যখন বিষয়টি জানতে পারলেন, তারা সাথে সাথে স্কুল কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করেন। স্কুল থেকে সেই বুলিংকারীদের সাময়িক বহিষ্কার করা হয় এবং আবীরকে নিয়মিত কাউন্সিলিং দেওয়া হয়। আজ আবীর আবারও স্কুলে যায়, তবে সেই ভয় কাটাতে তার অনেক সময় লেগেছে।
প্রতিকারে আমাদের করণীয়
  • শিক্ষকদের ভূমিকা: ক্লাসরুমে কোনো শিক্ষার্থী একা হয়ে যাচ্ছে কি না বা কারো আচরণে পরিবর্তন আসছে কি না, তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা।
  • অভিভাবকের বন্ধুত্ব: সন্তানের সাথে প্রতিদিন কথা বলা। সে যেন নির্ভয়ে তার সমস্যার কথা বলতে পারে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা।
  • জিরো টলারেন্স: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বুলিং বিরোধী আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা।
একটি মজা বা হাসাহাসি কারো জীবনের কান্না হয়ে দাঁড়াতে পারে। আসুন, ‘বুলিং’ শব্দটিকে আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে চিরতরে মুছে দিই। মনে রাখবেন, শব্দ দিয়ে যে আঘাত করা হয়, তার দাগ রক্তক্ষরণের চেয়েও গভীর হয়।

ভিজিট করুন: www.businesstoday24.com

প্রতিবেদনটি আপনার টাইমলাইনে শেয়ার করে অন্যদেরও বুলিং সম্পর্কে সচেতন করুন।