Home জাতীয় মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা : সংস্কারের সুবাতাস নাকি নিয়ন্ত্রণের শেকল?

মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা : সংস্কারের সুবাতাস নাকি নিয়ন্ত্রণের শেকল?

বিশেষ প্রতিবেদন: মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০২৫ (প্রথম পর্ব)

সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে মসজিদ পরিচালনার নীতিমালা এটা, এখানে কোন রকমের নিয়ন্ত্রণের আশঙ্কা অবান্তর: ধর্ম উপদেষ্টা

কামরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম: দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় পর দেশের মসজিদগুলোতে একক আইনি কাঠামো নিশ্চিত করতে সরকার কার্যকর করছে ‘মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, ২০২৫’। গত ১৮ জানুয়ারি ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এটি সারা দেশে বলবৎ হয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে একে ‘শৃঙ্খলার সুবাতাস’ বলা হলেও, সচেতন মুসল্লি ও স্থানীয় কমিটির অনেকের মনেই প্রশ্ন জেগেছে—এটি কি আসলে মসজিদের দীর্ঘদিনের চিরাচরিত স্বকীয়তার ওপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের এক নতুন শেকল?

শৃঙ্খলার তাগিদ ও নীতিমালার লক্ষ্য

নীতিমালাটির সূচনায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, ২০০৪ সালে জাতীয় সংসদে দেওয়া প্রতিশ্রুতির আলোকে মসজিদগুলোর ব্যবস্থাপনায় সামঞ্জস্য আনাই এর প্রধান লক্ষ্য। যত্রতত্র মসজিদ নির্মাণ বন্ধ করা এবং একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর আওতায় পরিচালনা নিশ্চিত করাকে সরকার সময়ের দাবি হিসেবে দেখছে।

এই নীতিমালার আওতায় মসজিদের পরিচালনা কমিটি গঠন থেকে শুরু করে ইমাম-খতীব নিয়োগ এবং আর্থিক আয়-ব্যয়ের হিসাব পর্যন্ত সবকিছুই একটি নির্দিষ্ট নিয়মের আওতায় আসবে।

যেখানে আশঙ্কার মেঘ (অনুচ্ছেদ ৩-এর প্রভাব)

নীতিমালার কয়েকটি ধারা নিয়ে সাধারণ মুসল্লি ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিশেষ বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে, নীতিমালার ৩ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, মসজিদের নামে নিজস্ব জমি (ওয়াকফ, কেনা বা বরাদ্দকৃত) না থাকলে এবং নীতিমালা বহির্ভূতভাবে নির্মিত হলে তা উচ্ছেদ করা যাবে। অনেকে মনে করছেন, বাংলাদেশে শত শত বছরের পুরনো অনেক মসজিদ রয়েছে যেগুলোর নথিপত্র পর্যাপ্ত নয়। এই ধারাটি প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রশাসনের অতি-উৎসাহ সাধারণ ইবাদতকারীদের মধ্যে উদ্বেগের জন্ম দিতে পারে।

মুসল্লিদের বয়ান: কী ভাবছেন সাধারণ মানুষ?

মসজিদে নিয়মিত যাতায়াতকারী বেসরকারি চাকুরিজীবী আহসান হাবিব বলেন, “অনেক সময় মসজিদের ভেতরেই গ্রুপিং আর মারামারি হয়। সরকার যদি নিয়ম করে দেয় যে কারা কমিটি চালাবে, তবে এই হানাহানি কমবে। এটাকে আমি সংস্কারের সুবাতাস হিসেবেই দেখি।”

তবে শেরশাহ এলাকার একজন প্রবীণ মুসল্লি আলহাজ্ব মোস্তফা কামাল কিছুটা শঙ্কিত। তিনি বলেন, “মসজিদ তো আল্লাহ্’র ঘর, এটা চলে জনগণের ভালোবাসায়। এখন যদি ৩ নম্বর অনুচ্ছেদের মতো কঠোর নিয়ম দিয়ে উচ্ছেদের ভয় দেখানো হয়, তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে অস্বস্তি বাড়বে। এটা এক ধরণের নিয়ন্ত্রণের শেকল হতে পারে।”

নীতিমালার বিশেষ কিছু দিক:

স্বচ্ছতা: প্রতি বছর অডিট বা নিরীক্ষার মাধ্যমে মসজিদের আয়-ব্যয় সাধারণের সামনে আনা হবে।

নারীদের সুযোগ: ইচ্ছা করলে কমিটি নারীদের জন্য পৃথক ইবাদতের কক্ষ বরাদ্দ করতে পারবে।

জমি সংক্রান্ত কড়াকড়ি: নিজস্ব বা বরাদ্দকৃত জমি ছাড়া মসজিদ নির্মাণ করলে আইনি ব্যবস্থা ও উচ্ছেদের বিধান রাখা হয়েছে।

যোগাযোগ করা হলে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, এই নীতিমালা এক ঐতিহাসিক কাজ। আমরা বহু দিন যাবত মুসল্লী, ইমাম ও মসজিদ কমিটির কল্যাণে এটা প্রণয়নে কাজ করেছি। স্টেকহোল্ডারদের মতামত নিয়েছি। সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে মসজিদ পরিচালনার নীতিমালা এটা, এখানে কোন রকমের নিয়ন্ত্রণের আশঙ্কা অবান্তর। ইমামদের চাকুরীর নিশ্চয়তা বিধানে প্রণীত হয়েছে  এই নীতিমালা।

তথ্যাভিজ্ঞমহল মনে করেন,  ‘মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০২৫’ এক বিশাল পরিবর্তনের নাম। এটি যদি কেবল শৃঙ্খলা এবং স্বচ্ছতা ফেরাতে ব্যবহৃত হয়, তবে তা সংস্কারের সুবাতাস হয়ে আসবে। কিন্তু যদি এর মাধ্যমে স্থানীয় ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ ঘটে, তবে তা নিয়ন্ত্রণের শেকল হিসেবেই সমালোচিত হবে।