“আমাদের লক্ষ্য কোনো মসজিদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা নয়। বরং আমরা নিশ্চিত করতে চাই যে, কোনো মসজিদ যেন ভুল পথে পরিচালিত না হয় এবং ইমাম-মুসল্লিদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা পায়। আলেম সমাজের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ করতে পেরে আমরা আনন্দিত।”—–ধর্ম বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন
কামরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম: দেশের মসজিদগুলোতে ইমাম, খতীব ও মুয়াজ্জিনদের সামাজিক মর্যাদা এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। দীর্ঘদিনের চলে আসা অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি বন্ধে ‘মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, ২০২৫’ জারি করা হয়েছে। এই নীতিমালায় নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে মসজিদের দৈনন্দিন কার্যাবলিতে একটি সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো নিশ্চিত করা হয়েছে।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের মতে, এটি ইমামদের চাকরির সম্মান রক্ষা এবং মসজিদকে সুশৃঙ্খল করার একটি ‘আন্তরিক প্রয়াস’।
নীতিমালাটির গেজেটভুক্ত ১০৫৮৩ নম্বর পৃষ্ঠার তথ্য অনুযায়ী, প্রথমবারের মতো মসজিদের জনবল কাঠামোকে জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫-এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়েছে। নির্ধারিত গ্রেডগুলো হলো:
খতিব, ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের জন্য জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫ অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট গ্রেড ও শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে:
| পদের নাম |
নির্ধারিত গ্রেড (জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫) |
শিক্ষাগত যোগ্যতা ও শর্ত |
| সিনিয়র পেশ ইমাম |
৫ম গ্রেড |
কামিল বা সমমান এবং সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে পূর্ব অভিজ্ঞতা। |
| পেশ ইমাম |
৬ষ্ঠ গ্রেড |
কামিল বা সমমান। |
| ইমাম |
৯ম গ্রেড |
কামিল/দাওরায়ে হাদিস বা সমমান। |
| প্রধান মুয়াজ্জিন |
১০ম গ্রেড |
ফাজিল বা সমমান এবং কিরাত ও আজানে পারদর্শিতা। |
| মুয়াজ্জিন |
১১তম গ্রেড |
আলিম বা সমমান। |
| প্রধান খাদিম |
১৫তম গ্রেড |
দাখিল বা সমমান। |
| খাদিম |
১৬তম গ্রেড |
ন্যূনতম জেডিসি বা সমমান। |
এই কাঠামোর ফলে ইমাম ও খতীবদের দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিশ্চয়তা দূর হবে এবং তারা একটি নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদার আওতায় আসবেন।
স্বচ্ছ নিয়োগে ৭ সদস্যের ‘বাছাই কমিটি’
নীতিমালা অনুযায়ী, এখন থেকে মসজিদের যেকোনো পদে নিয়োগের জন্য ৭ সদস্যের একটি সুনির্দিষ্ট ‘বাছাই কমিটি’ থাকবে। এই কমিটির সুপারিশ ও মেধা যাচাইয়ের পরীক্ষা ছাড়া কোনো নিয়োগ বৈধ হবে না।
এ বিষয়ে আনোয়ারার এক মসজিদের নিয়মিত কয়েকজন নিয়মিত মুসল্লি বললেন, “আগে অনেক সময় কমিটির প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আত্মীয়-স্বজনকে ইমাম হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার একটা প্রবণতা ছিল। এখন বাছাই কমিটির মাধ্যমে পরীক্ষা নিয়ে নিয়োগ দিতে হবে, যা মসজিদের জন্য প্রকৃত যোগ্য আলেম খুঁজে পেতে সাহায্য করবে।”
নীতিনির্ধারণে ইমামদের অংশগ্রহণ ও সুরক্ষা
ইমামদের কেবল নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মী নয়, বরং মসজিদের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। নীতিমালার ২৫(খ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, খতীব বা ইমাম পদাধিকারবলে মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।
এ বিষয়ে মাওলানা আবুল বশর নিজের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, “কমিটির সদস্য হিসেবে ইমামকে অন্তর্ভুক্ত করা একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে আলেমদের মতামতের গুরুত্ব বাড়বে এবং কমিটির খেয়ালখুশিমতো ইমামদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা কঠিন হবে।”
জ্ঞানচর্চায় ‘মসজিদ পাঠাগার’
সালাত আদায়ের পাশাপাশি মসজিদকে পুনরায় জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র করতে ৮ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রতিটি মসজিদে একটি করে ‘মসজিদ পাঠাগার’ স্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নিয়মিত মুসল্লি ও শিক্ষক আহসান হাবিব বলেন, “মসজিদে পাঠাগার থাকলে মুসল্লিরা বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম নামাজের আগে-পরে দ্বীনি শিক্ষা ও নৈতিক জ্ঞান অর্জন করতে পারবে। এটি একটি চমৎকার উদ্যোগ, তবে বই সংগ্রহের ক্ষেত্রে সঠিক তদারকি প্রয়োজন।”
নীতিমালার ২৬ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো অস্পষ্টতা দেখা দিলে সরকার তা নিরসন করবে।
ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, “আমাদের লক্ষ্য কোনো মসজিদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা নয়। বরং আমরা নিশ্চিত করতে চাই যে, কোনো মসজিদ যেন ভুল পথে পরিচালিত না হয় এবং ইমাম-মুসল্লিদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা পায়। আলেম সমাজের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ করতে পেরে আমরা আনন্দিত।”
‘মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০২৫’ বাংলাদেশের মসজিদগুলোতে পেশাদারিত্ব এবং শৃঙ্খলার এক ‘ঐতিহাসিক মাইলফলক’ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। তবে সাধারণ মুসল্লি ও আলেম সমাজের প্রত্যাশা, এই নিয়মগুলো যেন কেবল কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে মাঠপর্যায়ে যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়।