পর্ব ২:
ওমান স্মৃতির দুই দশক: স্মৃতির ধুলো ঝেড়ে দেখা
কামরুল ইসলাম
মাস্কাটের গ্র্যান্ড আল হায়াত হোটেলের জানালার পর্দা সরাতেই চোখে পড়ল রুক্ষ পাহাড়ের গায়ে ভোরের সূর্যের ঝিলিক। ওমানের সকালটা আমাদের দেশের মতো নয়, একটু বেশিই উজ্জ্বল। ২০০৬ সালের সেই সফরে আমরা অনুভব করেছিলাম, দেশ থেকে হাজার মাইল দূরেও এক টুকরো বাংলাদেশ কীভাবে জীবন্ত হয়ে আছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের প্রবাসীদের সেই রাজকীয় আতিথেয়তা আজও আমার স্মৃতিতে অমলিন। তবে সেই আতিথেয়তার আড়ালে প্রবাসের রাজনীতির এক বিচিত্র সমীকরণও আমাদের সাংবাদিক সত্তার নজর এড়ায়নি।

প্রবাসীদের নেতা: সিরাজুল হক ও ইয়াসিন চৌধুরী
মাস্কাটের রাজপথে বের হতেই দেখা ওমান প্রবাসী সফল ব্যক্তিত্বদের সাথে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সিরাজুল হক। তিনি তখন কেবল একজন সফল ব্যবসায়ীই ছিলেন না, ছিলেন ওমান প্রবাসীদের এক প্রভাবশালী নেতা এবং রাষ্ট্রদূত গোলাম আকবর খোন্দকারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন। রাষ্ট্রদূতের প্রতিটি পদক্ষেপে তাঁর ছায়া সঙ্গী হওয়া আমাদের নজর এড়ায়নি। বর্তমানে তিনি প্রবাসী বাংলাদেশিদের সরকার অনুমোদিত একমাত্র সংগঠন বাংলাদেশ সোশ্যাল ক্লাব-এর সভাপতি, সিআইপি।
অন্যদিকে, আমাদের সাথে সারাক্ষণ ছায়ার মতো ছিলেন মোহাম্মদ ইয়াসিন চৌধুরী। চট্টগ্রামের এই কৃতি সন্তান তখন থেকেই ওমানে একজন উদীয়মান ও সফল ব্যবসায়ী। পরবর্তীকালে তিনি টানা ৭ বার সিআইপি (CIP) নির্বাচিত হয়ে প্রবাসীদের মুখ উজ্জ্বল করেছেন এবং বর্তমানে ওয়ার্ল্ড এনআরবি সিআইপি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সোচ্চার ভূমিকা রাখছেন।

মেহমানদারি ও আত্মার টান: সৈয়দ মোহাম্মদ মনজুরুল ইসলাম
মাস্কাটে আমাদের সফরের বিভিন্ন পর্যায়ে ছায়ার মতো পাশে ছিলেন চট্টগ্রামের আরেক পরিচিত মুখ সৈয়দ মোহাম্মদ মনজুরুল ইসলাম। তাঁর সাথে সেখানে গিয়েই কারও কারও প্রথম পরিচয়, অথচ তাঁর ব্যবহার আর মেহমানদারি ছিল এতটাই অকৃত্রিম যে মনে হচ্ছিল তিনি আমাদের বহু বছরের চেনা কোনো নিকটাত্মীয়। প্রবাসে এসেও তিনি তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ আর দেশপ্রেম অটুট রেখেছেন। আশির দশকে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদলের প্রথম কমিটিতে সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিসেবে তাঁর হাতেখড়ি। পরবর্তীতে পাঁচলাইশ থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক এবং ৯০-এর দশকে ৮ নম্বর শুলকবহর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে রাজপথে সক্রিয় ছিলেন। প্রবাসে ওমান কেন্দ্রীয় বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক এবং পরবর্তীতে সভাপতির দায়িত্ব পালন করা এই মানুষটি আমাদের আড্ডা আর মেহমানদারিতে যে উষ্ণতা দিয়েছিলেন, তা ভুলবার নয়।
চট্টগ্রামের ‘গ্রুপিং’ ও রাজনীতির বিভাজন
ওমানে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ থাকলেও তলে তলে এর শেকড় ছিল বেশ গভীরে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের প্রবাসীদের মধ্যে দুটি শক্তিশালী গ্রুপের অস্তিত্ব আমরা তখনই টের পেয়েছিলাম। সেই গ্রুপিং বা দলাদলি আজও সেখানে বিদ্যমান। এমনকি সেখানে অবস্থানরত বিএনপির রাজনীতির ভেতরেও ছিল নানা উপদল। আমরা যখন তাঁদের সাথে আড্ডায় বসতাম, তখন সেই বিভাজনের রেখাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠত।
সুবিধাবাদী রাজনীতি ও ‘ডিগবাজি’
সাংবাদিক হিসেবে সবচেয়ে কৌতুককর লেগেছিল কিছু প্রবাসীর ‘সুবিধাবাদী’ চরিত্র। ওমান প্রবাসীদের একটি অংশ ছিল যারা রাজনীতিতে সবসময় পাল তোলা নৌকার মতো— যখন যে দল ক্ষমতায়, তারা সেই দলের ছত্রছায়ায় চলে আসত। ডিগবাজি খাওয়ায় তারা ছিল ওস্তাদ। ক্ষমতার পালাবদল ঘটার সাথে সাথে মোটা অংকের অনুদান দিয়ে সরকারি দলে নাম লেখানো ছিল তাদের পুরনো স্বভাব। ২০০৬ সালেও যেমন এমন সুবিধাবাদীদের আনাগোনা দেখেছি, শুনেছি আজও সেই ধারা একইভাবে অব্যাহত আছে।
প্রয়াত খুরশিদ আলমের সেই অমায়িক হাসি
আমাদের সেই সফরের আরেকজন নিবেদিতপ্রাণ মানুষ ছিলেন খুরশিদ আলম। আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই, পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন কয়েক বছর হলো। প্রবাসের রাজনৈতিক জটিলতা আর ব্যবসায়িক ব্যস্ততার মাঝেও তিনি যেভাবে আমাদের সময় দিয়েছিলেন, তা ছিল সত্যিই প্রশংসনীয়। তাঁর অমায়িক ব্যবহার আমাদের সাংবাদিক দলের সবাইকে আপন করে নিয়েছিল।
মাস্কাটের সন্ধ্যা ও প্রবাসীদের আড্ডা
মাস্কাটের সেই সন্ধ্যাগুলো ছিল উৎসবমুক্তর। কখনও সাগরের পাড়ে, কখনওবা প্রবাসীদের ড্রয়িংরুমে চলত আড্ডা। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক স্বাদের খাবারের আয়োজনে আমরা ভুলেই যেতাম যে আমরা ওমানে আছি। রাষ্ট্রদূত গোলাম আকবর খোন্দকার রাজনীতিবিদ হওয়ার সুবাদে এই প্রবাসীদের সাথে তাঁর এক নিবিড় সখ্য গড়ে তুলেছিলেন। নিষিদ্ধ রাজনীতির গণ্ডিতে থেকেও তিনি কীভাবে পুরো কমিউনিটির সাথে সমন্বয় বজায় রাখতেন, তা ছিল দেখার মতো।
মাস্কাটের সেই রঙিন দিনগুলো কাটিয়ে আমাদের পরের গন্তব্য ছিল ‘এক টুকরো বাংলাদেশ’ হিসেবে পরিচিত সালালাহ। কিন্তু মাস্কাটের এই প্রবাসীদের দেওয়া ভালোবাসা আর রাজনীতির সেই লুকোচুরি খেলা আজও স্মৃতিতে অমলিন।
পরবর্তী পর্বে থাকছে: সুলতান কাবুস গ্র্যান্ড মস্ক: স্থাপত্যের বিস্ময় ও এক পবিত্র জুমার স্মৃতি










