২০২৬ সালের ইরান যুদ্ধ আধুনিক সমরবিদ্যার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় যোগ করেছে। ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু হওয়ার মাত্র চার সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্র একটি বিশাল সামরিক গবেষণাগারে পরিণত হয়েছে। এই যুদ্ধ প্রমাণ করছে যে, দামী অস্ত্র মানেই জয় নয়, বরং সস্তা এবং কার্যকর প্রযুক্তিতেই লুকিয়ে আছে আগামীর সাফল্য।
যুদ্ধের নতুন অর্থনীতি
এই যুদ্ধের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো ‘ইউনিট ইকোনমিক্স’ বা অস্ত্রের খরচ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা কয়েক দশক ধরে অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং উচ্চ প্রযুক্তির অস্ত্র তৈরি করেছে। যেমন, একটি ‘প্যাট্রিয়ট’ মিসাইল দিয়ে একটি ড্রোন ধ্বংস করতে খরচ হচ্ছে প্রায় ৩ থেকে ৪ মিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে, ইরান ব্যবহার করছে মাত্র ২০ থেকে ৮০ হাজার ডলার মূল্যের ‘শাহেদ-১৩৬’ ড্রোন। অর্থাৎ, একটি প্যাট্রিয়ট মিসাইলের দামে ইরান অন্তত ৭০টি ড্রোন আকাশে ওড়াতে পারছে। এই অর্থনৈতিক অসমতা পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক বাজেটকে বড় ধরনের চাপে ফেলে দিয়েছে।
ফুরিয়ে যাচ্ছে মিসাইলের মজুদ
পেন্টাগনের তথ্যমতে, যুদ্ধের প্রথম তিন দিনেই যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৪০০ টমাহক ক্রুজ মিসাইল খরচ করেছে। এটি তাদের মোট মজুদের প্রায় ১০ শতাংশ। অথচ এই পরিমাণ মিসাইল তৈরি করতে তাদের কয়েক বছর সময় লাগে। বিপরীত দিকে, ইরান ও তার সহযোগীরা প্রতি মাসে শত শত ড্রোন তৈরি করছে, যা যুদ্ধের ময়দানে তাদের অবস্থানকে সংহত করছে।
পাকিস্তানের কৌশলগত অবস্থান
এই সংকটে পাকিস্তান এক অনন্য কূটনৈতিক অবস্থানে দাঁড়িয়েছে। ইসলামাবাদ বর্তমানে ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে। পাকিস্তান ইতিমধ্যে আমেরিকার ১৫ দফা যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব ইরানের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। মে ২০২৫-এর ভারত-পাকিস্তান আকাশযুদ্ধে চীনা প্রযুক্তির (J-10C এবং PL-15) সফল ব্যবহারের পর পাকিস্তানের সামরিক গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
তেলের বাজারে অস্থিরতা
যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ২০০ ডলার ছাড়ানোর উপক্রম হয়েছে। হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ থাকায় বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ভারত, যারা তাদের চাহিদোর ৮০ শতাংশ তেল আমদানি করে, তারা এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
কেনাকাটার কৌশলে পরিবর্তন
বিশ্লেষকরা বলছেন, পাকিস্তানের জন্য এখন সময় এসেছে তাদের প্রতিরক্ষা কেনাকাটার কৌশল পরিবর্তন করার। আমেরিকার F-16 ড্রোনের রক্ষণাবেক্ষণে যে বিশাল অর্থ ব্যয় হয়, তা দিয়ে হাজার হাজার অ্যাটাক ড্রোন তৈরি করা সম্ভব। প্রযুক্তির এই লড়াইয়ে পাকিস্তান যদি নিজস্ব সক্ষমতা এবং সস্তা কিন্তু কার্যকর অস্ত্রের দিকে নজর দেয়, তবেই তারা দীর্ঘমেয়াদী সুবিধা পাবে।
এখন প্রশ্ন হলো, মধ্যস্থতার টেবিলে পাকিস্তান যে গতি দেখাচ্ছে, সেই একই গতিতে তারা তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক ও সময়োপযোগী করতে পারবে কি না।