বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, রাজশাহী: মাঘের কনকনে শীত আর কুয়াশার চাদরে মোড়ানো রাজশাহী। প্রকৃতির নিয়মে আরও অন্তত দুই সপ্তাহ পর বসন্তের আগমনী গান গাওয়ার কথা ছিল আম গাছগুলোর। কিন্তু জলবায়ুর নাটকীয় পরিবর্তনে এবার পঞ্জিকার নিয়ম উল্টে গেছে। রাজশাহীর কাশিয়াডাঙ্গা থেকে ভাদরা—পথের ধারের আম গাছগুলোতে এখন সোনালী মুকুলের উঁকিঝুঁকি। শীতের হিমেল হাওয়ায় মিশে আছে বসন্তের সেই চেনা ঘ্রাণ, যা একই সাথে বিস্ময় ও দুশ্চিন্তা জাগিয়েছে স্থানীয়দের মনে।
কেন এমনটি ঘটছে?
সময়ের আগে মুকুল আসার প্রধান কারণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তন এবং অস্বাভাবিক তাপমাত্রাকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাপমাত্রার তারতম্য: আমের মুকুলের জন্য দিনের বেলা উষ্ণ রোদ এবং রাতে শীতের প্রয়োজন হয়। গত ডিসেম্বরের শেষে এবং জানুয়ারির শুরুতে দিনের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি থাকায় গাছগুলো একে মুকুলের উপযুক্ত সময় হিসেবে গ্রহণ করেছে।
হরমোনের প্রভাব: দীর্ঘ খরা বা আর্দ্রতার অভাবও অনেক সময় গাছের হরমোন পরিবর্তন করে দ্রুত মুকুল আনতে উৎসাহিত করে।
আম চাষি ও সাধারণ মানুষের কথা
এই অকাল মুকুল চাষিদের মধ্যে স্বস্তির চেয়ে আশঙ্কাই বেশি তৈরি করেছে:
চাষিদের উদ্বেগ: কাশিয়াডাঙ্গার আম চাষি রহমত আলী জানান, “এখন যে মুকুল এসেছে, তা টিকিয়ে রাখা কঠিন। যদি সামনে আরও একটি বড় শৈত্যপ্রবাহ আসে বা কুয়াশা বাড়ে, তবে এই কচি মুকুলগুলো কালো হয়ে ঝরে যাবে।”
অতিরিক্ত খরচ: আগাম মুকুল রক্ষা করতে হলে এখন থেকেই কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে হচ্ছে, যা চাষিদের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সাধারণ মানুষের বিস্ময়: সাধারণ নগরবাসীরা মুকুল দেখে আনন্দিত হলেও পরিবেশ নিয়ে চিন্তিত। অনেকে বলছেন, প্রকৃতির ঋতুচক্র বদলে যাওয়ার এটি একটি স্পষ্ট সংকেত।
অতীতেও কি এমন হয়েছে?
হ্যাঁ, এটি একেবারে নজিরবিহীন নয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর প্রবণতা বেড়েছে:
২০২১ ও ২০২৩ সাল: এই দুই বছরেও রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের কিছু এলাকায় জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে মুকুল দেখা গিয়েছিল।
সাতক্ষীরা ও মেহেরপুর: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই জেলাগুলোতে ভৌগোলিক কারণে রাজশাহীর আগেই মুকুল আসে। সেখানে অনেক সময় ডিসেম্বরের শেষেই মুকুল আসার রেকর্ড রয়েছে। তবে রাজশাহীর মতো বরেন্দ্র অঞ্চলে এত দ্রুত মুকুল আসাটা পরিবেশগত পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত দেয়।
কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মতে, আগাম মুকুল নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তবে কুয়াশা থেকে মুকুল বাঁচাতে গাছে সালফার জাতীয় ছত্রাকনাশক স্প্রে করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। যদি আবহাওয়া খুব বেশি অনুকূলে না থাকে, তবে এই মুকুলগুলো ভেঙে দিলে পরবর্তীতে আবার মুকুল আসার সম্ভাবনা থাকে।