Home আন্তর্জাতিক ক্ষতিপূরণে শত বছর: যুদ্ধের এক নীরব পরিবেশগত মহাপ্রলয়

ক্ষতিপূরণে শত বছর: যুদ্ধের এক নীরব পরিবেশগত মহাপ্রলয়

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
যুদ্ধের দামামা যখন থেমে যায়, তখন শুরু হয় এক দীর্ঘস্থায়ী ও অদৃশ্য লড়াই। আধুনিক মারণাস্ত্র, রাসায়নিক বিস্ফোরক এবং সামরিক কৌশলের কারণে পৃথিবীর ফুসফুস খ্যাত বনভূমি, উর্বর মাটি এবং সুপেয় পানির আধারগুলো এমনভাবে বিষাক্ত হয়, যার প্রভাব প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে পড়ে।
মাটির মৃত্যু ও বিষাক্ত উত্তরাধিকার
একটি শক্তিশালী বোমা যখন বিস্ফোরিত হয়, সেটি কেবল মাটির উপরিভাগ উপড়ে ফেলে না, বরং মাটির গভীরে থাকা অনুজীব বা মাইক্রোবায়োম ধ্বংস করে দেয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাত্র এক ইঞ্চি উর্বর টপ-সয়েল তৈরিতে প্রকৃতির সময় লাগে প্রায় ২০০ থেকে ৫০০ বছর। যুদ্ধ সেই অমূল্য সম্পদকে মুহূর্তেই তামাটে ও অনুর্বর করে দেয়। এছাড়া বিস্ফোরকের অবশিষ্টাংশ যেমন পারদ, আর্সেনিক এবং ক্যাডমিয়াম মাটিতে মিশে যাওয়ার পর তা কয়েকশ বছর সক্রিয় থেকে খাদ্যশৃঙ্খলে বিষ ছড়াতে থাকে।
বাস্তুসংস্থানের শৃঙ্খলা ও প্রাণবৈচিত্র্যের বিলুপ্তি
যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে বন্যপ্রাণীদের আবাসস্থল চিরতরে হারিয়ে যায়। কোনো নির্দিষ্ট প্রজাতির বিলুপ্তি বা তাদের প্রজনন চক্রে আঘাত হানা হলে সেই শূন্যস্থান পূরণ হওয়া প্রায় অসম্ভব। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অফ নেচার (IUCN)-এর মতে, মধ্যপ্রাচ্য বা আফ্রিকার মতো অঞ্চলে যুদ্ধের কারণে বাস্তুসংস্থানের যে ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে, তা পুনরায় আগের অবস্থায় ফিরে যেতে শত বছরের বেশি সময় প্রয়োজন।
ইকোসাইড: প্রজন্মের বিরুদ্ধে অপরাধ
বর্তমানে পরিবেশবিদরা যুদ্ধকালীন পরিবেশ ধ্বংসকে ‘ইকোসাইড’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। এটি কেবল রাজনৈতিক সীমারেখা পরিবর্তন করে না, এটি আমাদের বেঁচে থাকার মৌলিক উৎসগুলোকে পঙ্গু করে দেয়। ভিয়েতনাম যুদ্ধে ব্যবহৃত রাসায়নিকের বিষক্রিয়া আজও সেখানকার মানুষের ডিএনএ এবং মাটির গুণাগুণে দৃশ্যমান, যা প্রমাণ করে যে প্রকৃতির ক্ষত কত গভীর হতে পারে।
১. ড. টরেন্টো ক্যাস্ট্রো (পরিবেশ গবেষক): তার মতে, “যুদ্ধের ধ্বংসাবশেষ কেবল ইট-পাথর নয়, এটি রাসায়নিকের একটি জীবন্ত আগ্নেয়গিরি যা ভূগর্ভস্থ পানিকে শত বছর ধরে বিষাক্ত রাখতে পারে।”
২. কনফ্লিক্ট অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট অবজারভেটরি (CEOBS): তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামরিক অভিযানের কার্বন ফুটপ্রিন্ট এবং যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন প্রক্রিয়া বৈশ্বিক জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রাকে অন্তত ৫০ থেকে ৮০ বছর পিছিয়ে দেয়।
৩. ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ‘কস্টস অব ওয়ার’ প্রজেক্ট: এই গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রত্যক্ষ প্রাণহানির চেয়ে পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে পরোক্ষ মৃত্যুর হার অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী এবং এটি পুনরুদ্ধার করতে আন্তর্জাতিক সংহতি ছাড়া এক শতাব্দীও যথেষ্ট নয়।
৪. জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP): ইউএনইপি-এর বিশেষ মূল্যায়নে জানানো হয়েছে, যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট বিষাক্ত বর্জ্য এবং রাসায়নিক দূষণ পরিষ্কার করে একটি অঞ্চলকে পুনরায় বাসযোগ্য করতে যে সময় ও অর্থের প্রয়োজন, তা একটি দেশের কয়েক প্রজন্মের উন্নয়নকে রুদ্ধ করে দেয়।
পরবর্তী আপডেট পেতে businesstoday24.com ফলো করুন