ঘণ্টায় জন্মাচ্ছে ৬ শিশু: রোহিঙ্গা বিস্ফোরণ ও জাতীয় নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ কী?
বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে জাতীয় নিরাপত্তা এবং রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের রূপরেখা অন্তর্ভুক্ত করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ ও কৌশলগত বিশ্লেষকরা।
তারা সতর্ক করে বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকট এখন আর কেবল মানবিক সমস্যা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক ভয়াবহ ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) বিকেলে চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ, বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি) এর উদ্যোগে সাউদার্ন ইউনিভার্সিটির স্থায়ী ক্যাম্পাসে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা উঠে আসে।
রোহিঙ্গা সংকট ও জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি
বৈঠকে বক্তারা উল্লেখ করেন, রোহিঙ্গা সমস্যার দীর্ঘসূত্রতা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান নাজুক পরিস্থিতির সঙ্গে রোহিঙ্গাদের রাজনৈতিক ও সশস্ত্র সমস্যা যুক্ত হলে তা দেশের জন্য বিরাট বিপদ ডেকে আনবে।
২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, গত ৮ বছরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জনসংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৪ লাখ। প্রতি ঘণ্টায় জন্ম নিচ্ছে ৬টি শিশু, যা বছরে প্রায় ৫০ হাজার। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর ভার দীর্ঘমেয়াদে বহন করা বাংলাদেশের পক্ষে অসম্ভব।
রাজনৈতিক ঐক্যের আহ্বান
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার মীর হেলাল উদ্দিন বলেন, “রোহিঙ্গা ইস্যুতে কোনো ভিন্নমত পোষণ করার সুযোগ নেই। ১৯৭৮ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও কঠোর বার্তার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতিসহ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করেছিলেন। বর্তমান সংকটেও সকল রাজনৈতিক দলকে জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।”
ইশতেহারে স্পষ্ট বক্তব্য প্রয়োজন
ধারণাপত্র উপস্থাপনকালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও সিসিআরএসবিডি-র নির্বাহী পরিচালক ড. মাহফুজ পারভেজ বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার লড়াই না করে জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে দলগুলোর ইশতেহারে স্পষ্ট অবস্থান থাকতে হবে।
আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ও স্থানীয় সংকট
বৈঠকে আলোচকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আসিয়ান বা বিমসটেকের মতো আঞ্চলিক জোটগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখছে না। আন্তর্জাতিক অনেক দেশ মানবিকতার কথা বললেও পর্দার আড়ালে নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থে এই সংকটকে দীর্ঘস্থায়ী করার মতলব আঁটছে।
এছাড়া ক্যাম্পে আশ্রিতদের মধ্যে স্বার্থান্বেষী উপদল তৈরি হওয়া এবং স্থানীয়দের সঙ্গে দ্বন্দ্বের বিষয়গুলো জাতীয় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বৈঠকের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ
সিসিআরএসবিডি-র চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক ছিলেন চবি উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) প্রফেসর ড. মো: কামাল উদ্দিন। এছাড়াও জামায়াতে ইসলামী, গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা আলোচনায় অংশ নেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রফেসর সরওয়ার জাহান।
বক্তারা একমত হন যে, মিয়ানমারের এনভিসি (NVC) কার্ড বা বৈষম্যমূলক নাগরিকত্ব আইন দিয়ে প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়। বরং একটি টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও শক্তিশালী কূটনৈতিক তৎপরতার কোনো বিকল্প নেই।