আজহার মুনিম, লন্ডন: হাইড পার্কের পাশ দিয়ে হাঁটছিলাম। জুনের রোদ গায়ে এসে লাগছে। গরম নয়, উষ্ণ। এমন আবহাওয়ায় লন্ডনের মানুষজন যেন হঠাৎ করেই বদলে যায়, গম্ভীর মুখগুলো একটু হাসে, ছায়ায় বসে পাতা ওল্টায়, কেউ কেউ বারান্দায় দাঁড়িয়ে গান গায়।
তবে এই শহরটা এখন আর সেই আগের মতো নেই। থেমে নেই সময়। নতুন ব্রিটেন এখন বহুসংস্কৃতির আরও জটিল রূপ—বাংলাদেশি তরুণের কাঁধে উবার ব্যাগ, সোমালিয়ান মা সন্তানকে স্কুলে পৌঁছে দিচ্ছেন, পাশেই এক ব্রিটিশ বৃদ্ধ স্মার্টফোনে রেডিও শুনছেন।
সস্তা চা, দামি জীবন
হোয়াইটচ্যাপেল, ব্রিক লেন, বাঙালি পাড়া—এখনও টিকে আছে। তবে জাঁকজমক কমেছে। এক কাপ চা এখন এক পাউন্ড। অথচ গল্পটা একই—‘শুনছো, দেশে আবার ডলার সংকট?’ প্রশ্ন করেন এক রেস্টুরেন্ট মালিক। তাঁর কথায় মিশে আছে হালকা হতাশা। ব্রেক্সিট পরবর্তী ব্রিটেনে তার কাঁচামালের দাম বেড়েছে। রান্নাঘরের পেঁয়াজ, রসুনও যে এখন বৈশ্বিক রাজনীতির শিকার।
পরিযায়ী পাখিদের শহর
লন্ডন মূলত অভিবাসীর শহর। এখানে এসে সবাই নিজের মতো করে লড়াই করে বাঁচে। টেমসের পাশে দাঁড়িয়ে মনে হয় এই নদী কত ইতিহাস জানে! চার্চিল, ভিক্টোরিয়া কিংবা ব্রিটিশ সাম্রাজ্য—সব ইতিহাসের চেয়ে বড় সত্য হলো, আজ এখানে একেক জাতির মানুষ একে অপরের গায়ে ভর করেই বেঁচে আছে।
বাংলাদেশিরাও এই শহরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। লন্ডনের কাউন্সিলে এখন বাঙালি নামও চোখে পড়ে—তারা শিক্ষক, ব্যবসায়ী, কাউন্সিলর, এমনকি বারিস্টার পর্যন্ত। তবে নতুন প্রজন্মের মধ্যে কিছুটা দ্বিধা, তারা কি ব্রিটিশ, না বাঙালি? প্রশ্নটা গভীর।
ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে যুদ্ধ
প্রবাস জীবন মানেই সময়ের সঙ্গে দৌড়। সকাল ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত একেকজন ডেলিভারি করে, বাস চালায়, হাসপাতালের কেয়ার হোমে কাজ করে। কেউ সিটি ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস করে, আবার রাতে ক্যাব চালায়।
তবে, এই যুদ্ধের মাঝেও কেউ কেউ শিল্পচর্চা করে, কেউ আবার বাংলাদেশ নিয়ে লেখে, গানে স্বদেশ খোঁজে। চ্যানেল এস, বাংলা টিভি বা ইউটিউব, এগুলো এখন ব্রিটেনের বাংলার ঘরের গল্প বলে।
স্বদেশ দূরে, মন কাছে
রানির দেশ বলে পরিচিত হলেও এখন ব্রিটেন অনেকটাই বাস্তববাদী রাষ্ট্র। জীবনযাত্রা ব্যয়বহুল, বাড়িভাড়া বেড়েছে, রেশনিংও কঠিন। তবুও সবাই টিকে থাকার চেষ্টা করে।
প্রতিদিন কেউ না কেউ নতুন ভিসা নিয়ে আসছে, কেউ কেউ দেশে ফিরে যাচ্ছে। কিন্তু এখানকার প্রতিটি প্রবাসী হৃদয়ে গোপনে একটাই ঠিকানা রাখে, বাংলাদেশ। কেউ হয়তো সকালে বারান্দায় দাঁড়িয়ে রোদের মাঝে স্মৃতির ঢাকা শহর দেখে।
এটাই লন্ডনের চিঠি, একটি শহরের গল্প, যা প্রতিনিয়ত বদলায়, তবু প্রবাসীদের ভালোবাসায় এক ধরনের শিকড় গেড়ে বসে থাকে।
লন্ডনের হাইড পার্ক থেকে হোয়াইটচ্যাপেল, প্রবাসী বাঙালিদের জীবন সংগ্রাম ও ভালোবাসার গল্প নিয়েই এই ‘লন্ডনের চিঠি’। পড়ুন বিজনেসটুডে২৪-এর বিশেষ ফিচার।









