Home Second Lead সদ্য বাবা হওয়া রাজপথ কাঁপানো ‘বিপ্লবী’র জীবনযুদ্ধ

সদ্য বাবা হওয়া রাজপথ কাঁপানো ‘বিপ্লবী’র জীবনযুদ্ধ

শরিফ ওসমান হাদি

বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অগ্নিগর্ভ দিনগুলোতে রামপুরা-বাড্ডা এলাকা যার স্লোগান আর নির্দেশনায় প্রকম্পিত হতো, সেই অকুতোভয় কণ্ঠস্বরটি আজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখসারির যোদ্ধা, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র এবং ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরীফ ওসমান হাদি দুর্বৃত্তের গুলিতে গুরুতর আহত হয়েছেন।

শুক্রবার (১২ ডিসেম্বর) দুপুরে রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণার সময় এই হামলার ঘটনা ঘটে। রাজনৈতিক মেরুকরণ, কঠোর সমালোচনা আর আপসহীন অবস্থানের কারণে আলোচিত এই তরুণ নেতার ওপর হামলায় স্তম্ভিত তাঁর সহযোদ্ধা ও অনুসারীরা।

রাজপথ থেকে রক্তে ভেজা বিছানায়
৩৩ বছর বয়সী শরীফ ওসমান হাদি গত বছরের জুলাই অভ্যুত্থানে ছিলেন ছাত্র-জনতার প্রতিরোধের অন্যতম সমন্বয়ক। রামপুরা ও বাড্ডা জোনে তাঁর নেতৃত্ব ছিল চোখে পড়ার মতো। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে তিনি নিজেকে পুরোপুরি রাজনৈতিক সংস্কার ও ‘ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র’ গঠনের কাজে নিয়োজিত করেন।

শুক্রবার দুপুরে তিনি যখন নিজের নির্বাচনী এলাকা হিসেবে ঘোষিত ঢাকা-৮ আসনের বিজয়নগরে প্রচারণায় ব্যস্ত, তখনই দুর্বৃত্তরা তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তাঁর অবস্থা সংকটাপন্ন।

ঝালকাঠি থেকে ঢাকার রাজপথ: এক লড়াকু জীবন
ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার হাড়িখালী গ্রামের মুন্সিবাড়ির মরহুম মাওলানা আব্দুল হাদির ছোট ছেলে শরীফ ওসমান। নেছারাবাদ মাদ্রাসা থেকে দাখিল ও আলিম পাসের পর ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই তিনি ছাত্রলীগের নিপীড়নবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। ২০১৮ সালের কথিত ‘রাতের ভোট’ এবং ২০২১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরবিরোধী আন্দোলনেও তিনি ছিলেন সম্মুখসারিতে। পেশাগত জীবনে সাইফুর’সসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করা হাদি একজন কবিও। তবে গত এক বছরে তাঁর পরিচয় বদলে গেছে ‘বিপ্লবী’ হিসেবে।

ইনকিলাব মঞ্চ ও স্বতন্ত্র রাজনীতি
গত বছরের ১৩ আগস্ট তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘ইনকিলাব মঞ্চ’। জাতীয় নাগরিক কমিটিতে যুক্ত থাকলেও পরবর্তীতে দল না করে স্বতন্ত্র অবস্থানে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। সাধারণ মানুষের ক্ষুদ্র চাঁদায় তিনি গড়ে তুলেছেন ইনকিলাব পাঠাগার ও সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র।

হাদি তাঁর বক্তৃতার জন্য যেমন জনপ্রিয়, তেমনি বিতর্কিতও। গত ফেব্রুয়ারিতে শেখ হাসিনার বক্তব্যের প্রতিবাদে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় ইনকিলাব মঞ্চের নাম জড়িয়েছিল। আওয়ামী লীগ, দলটির অনুসারী বুদ্ধিজীবী, এমনকি বিএনপি-জামায়াতের ‘পুরোনো ধারার রাজনীতি’র কঠোর সমালোচক তিনি। এমনকি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের কাঠামোগত দুর্বলতা নিয়েও তিনি ছিলেন সোচ্চার।

তার ঝাঁঝালো বক্তব্যকে অনেকে ‘গালিগালাজ’ বললেও হাদি একে আখ্যায়িত করেছেন ‘মুক্তির মহাকাব্য’ হিসেবে। তিনি বিশ্বাস করেন, আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষাই জুলাইয়ের মূল চেতনা।

পরিবারে অজানা আশঙ্কা
কয়েক মাস আগেই একটি পুত্রসন্তানের বাবা হয়েছেন ওসমান হাদি। ঘরে তাঁর স্ত্রী ও দুগ্ধপোষ্য শিশু, আর বাইরে তিনি লড়ছিলেন রাষ্ট্রের আমূল পরিবর্তনের স্বপ্নে। ঢাকা-৮ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রচারণাও শুরু করেছিলেন জোরেশোরে। কিন্তু শুক্রবারের এক ঝটিকা হামলা সবকিছুকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

হাদির ওপর এই হামলা কি শুধুই রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো গভীর ষড়যন্ত্র—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তবে জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলোতে যিনি বুলেটের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, স্বাধীন দেশে সেই বুলেটের আঘাতেই তাকে আজ মৃত্যুর সাথে লড়তে হচ্ছে—এটাই নির্মম বাস্তবতা।