Home নির্বাচন সুষ্ঠু নির্বাচনের অঙ্গীকার ও নৈতিক নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা

সুষ্ঠু নির্বাচনের অঙ্গীকার ও নৈতিক নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা

সম্পাদকীয়

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নানা রাজনৈতিক জটিলতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং জনমতের চাপের মধ্যেই সরকারের পক্ষ থেকে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের অঙ্গীকার উঠে আসছে। চট্টগ্রামে এক অনুষ্ঠানে ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ. ফ. ম. খালিদ হোসেনের বক্তব্য এই প্রেক্ষাপটে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনের মাধ্যমে যারা বিজয়ী হবেন, তাদের হাতে দায়িত্ব হস্তান্তর করে সরকার বিদায় নেবে। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেছেন, “পুরানো জাহেলি যুগ আর ফিরে আসবে না।”

রাজনৈতিক ভাষ্য বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে “জাহেলি যুগ” শব্দচয়নটি তাৎপর্যময়। ইসলামী পরিভাষায় জাহেলি বলতে বোঝায় নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও মানবিক মূল্যবোধহীন এক অস্থির সমাজব্যবস্থা। এই শব্দ ব্যবহার করে উপদেষ্টা মূলত ইঙ্গিত দিয়েছেন এমন এক সময়ের দিকে, যখন ক্ষমতার অপব্যবহার, সহিংসতা, অস্থিরতা ও অনৈতিক আচরণ সমাজকে দুর্বল করেছিল। তাই তার বক্তব্যের ভেতরে স্পষ্ট বার্তা রয়েছে, রাষ্ট্র পরিচালনা হতে হবে নৈতিকতা, স্বচ্ছতা এবং জনআস্থার ভিত্তিতে।

বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে আস্থাহীনতা একটি দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা। ভোটের অধিকার নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বারবার দেখা গেছে। বিভিন্ন সময় নির্বাচনকে ঘিরে পক্ষপাতিত্ব, রাজনৈতিক সংঘর্ষ ও জবাবদিহিহীনতার অভিযোগও উঠেছে। এমন বাস্তবতায় সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার ইতিবাচক হলেও, তা কেবল বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকলে জনগণের আস্থা ফিরে আসবে না। বিশ্বব্যাপী অভিজ্ঞতা বলে, অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করতে চাইলে প্রশাসনিক কাঠামোর নিরপেক্ষতা, দলমত নির্বিশেষে সবার নিরাপত্তা এবং বিরোধী দলের রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার স্বাধীনতা অপরিহার্য।

ধর্ম উপদেষ্টার বক্তব্যে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে, নৈতিক নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা। তার বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের দুর্নীতি, ঘুষ, সুদ বা চাঁদাবাজি রোধ করতে হলে এমন নেতৃত্ব প্রয়োজন, যাদের অন্তরে আল্লাহভীতি বা নৈতিক ভীত রয়েছে। এই বক্তব্য ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে প্রাসঙ্গিক হলেও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দৃষ্টিকোণ থেকেও এর একটি বাস্তব ভিত্তি রয়েছে। ইতিহাস বলছে, সমাজ তখনই উন্নত হয় যখন নেতৃত্ব নৈতিক মানদণ্ডে দৃঢ় থাকে, ক্ষমতার অপব্যবহার কমে এবং রাষ্ট্রে জবাবদিহিতার পরিবেশ গড়ে ওঠে।

তবে এও মনে রাখতে হবে, নৈতিকতার ধারণা কেবল ধর্মীয় মূল্যবোধে সীমাবদ্ধ নয়। সুশাসন, স্বচ্ছতা, মানবাধিকার, আইনের শাসন ও বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর প্রতি সম্মান, সবকিছু মিলিয়েই একটি নৈতিক রাষ্ট্র কাঠামো তৈরি হয়। তাই দেশকে “জাহেলি যুগে” ফিরে যেতে না দিতে হলে নেতৃত্বকে হতে হবে নৈতিক, দায়িত্বশীল এবং জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক। আর এ নেতৃত্ব নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই আসতে হবে, যা হতে হবে বিশ্বাসযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক।

২০২৬ সালের নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন মোড় আনতে পারে। দেশের তরুণ প্রজন্ম, যারা এখন সবচেয়ে বড় ভোটারগোষ্ঠী, তারা চায় সুশাসন, স্থিতিশীলতা এবং সমান সুযোগের সমাজ। তাই নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তবধর্মী পরিকল্পনা এবং জনগণের আস্থাযোগ্য নেতৃত্ব উপস্থাপন করা।

ধর্ম উপদেষ্টার বক্তব্য তাই শুধু রাজনৈতিক অঙ্গীকার নয়, বরং একটি নৈতিক প্রতিশ্রুতির দিকেও ইঙ্গিত করে। এখন মূল প্রশ্ন, এই প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়িত হবে এবং কতটা আস্থার জন্ম দেবে? কারণ জনগণ এখন আর কেবল বক্তব্য শোনে না; তারা প্রত্যাশা করে কার্যকর পদক্ষেপ।