বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: সাভারে মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে ছয়টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার সবুজ শেখ ওরফে মশিউর রহমান সম্রাটের অপরাধ জগতের চাঞ্চল্যকর সব তথ্য বেরিয়ে আসছে। তদন্তে জানা গেছে, এই ‘সিরিয়াল কিলার’ বছরের পর বছর ধরে পরিচয় ও অবস্থান গোপন করে একের পর এক অপরাধ করে আসছিল। কখনো ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ সাজা, আবার কখনো ছদ্মনাম ব্যবহার করে সে পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকার চেষ্টা করেছে।
এক দশক আগেই শুরু খুনের নেশা
পুলিশি তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, সবুজের খুনের হাতেখড়ি ১০ বছরেরও বেশি সময় আগে। ২০১৪ সালে সাভারের শাপলা হাউজিং এলাকায় জুবায়ের ওরফে শাওন (৩০) হত্যা মামলার প্রধান আসামি ছিল এই সবুজ। তৎকালীন পুলিশি চার্জশিটে তার নাম ছিল ‘সম্রাট ওরফে টাইগার সম্রাট’। সে সময় তার পরিচয় অস্পষ্ট থাকলেও বর্তমান তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, এই সম্রাটই বর্তমানের আটককৃত সবুজ। এছাড়া ২০১৯ এবং ২০২৩ সালে সাভার মডেল থানায় তার বিরুদ্ধে দুটি মাদক মামলাও রয়েছে।
অপরাধের কৌশল: ভাসমান মানুষই লক্ষ্য
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, সবুজের হত্যার ধরণ ছিল সুনির্দিষ্ট। সে মূলত ভাসমান মানুষদের টার্গেট করত। রাতের বেলা ফুটওভার ব্রিজে ঘুরে ঘুরে নিঃসঙ্গ ও ভাসমান মানুষদের ফুসলিয়ে নির্জন স্থানে নিয়ে যেত সে। দুই-একদিন নিজের কাছে রাখার পর তাদের হত্যা করে লাশ পুড়িয়ে আলামত নষ্ট করার চেষ্টা করত।
এমনকি গ্রেপ্তারের আগেও এক নারীকে পরিত্যক্ত পৌর কমিউনিটি সেন্টারে নিয়ে গিয়েছিল সে, যাকে হত্যার পরিকল্পনা ছিল তার।
বারবার ঠিকানা পরিবর্তন ও ছদ্মবেশ
সবুজ ছিল মূলত একজন যাযাবর অপরাধী। ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকতে সে ক্রমাগত অবস্থান ও নাম পরিবর্তন করত।
২০১৪ সাল: ব্যবহার করেছে রাজধানীর আরমানিটোলা এলাকার ঠিকানা।
২০১৯ ও ২০২৩ সাল: মাদক মামলায় ঠিকানা দিয়েছে কেরানীগঞ্জের আটিবাজার।
নিজ গ্রাম: মুন্সিগঞ্জের লৌহজংয়ে তার বিরুদ্ধে চুরি ও ছিনতাইয়ের অভিযোগ থাকলেও সেখানে সে স্থায়ী হতো না।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, বিভিন্ন স্থানে নাম ও ঠিকানা পাল্টালেও সবুজ কখনো তার বাবার নাম পরিবর্তন করেনি, যা তাকে শনাক্ত করতে পুলিশকে সহায়তা করেছে।
পরিবারের ভাষ্য: ‘মানসিক সমস্যা’ নাকি আড়াল?
মুন্সিগঞ্জের মৌছামান্দ্রা গ্রামে সবুজের জীর্ণ বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় তার পরিবারের মানবেতর চিত্র। সবুজের ছোট ভাই রায়হানের দাবি, সবুজ একা একা কথা বলত এবং মানসিকভাবে অসুস্থ ছিল।
মা মমতাজ বেগম জানান, এক বছর আগে জনৈক তরুণীকে নিয়ে সবুজ বাড়ি গিয়েছিল। গত কয়েক বছর ধরে তার আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করেন তারা। তবে স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. সোহেল খান জানান, সবুজ এলাকায় মাদক ও চুরির জন্য কুখ্যাত ছিল এবং সম্প্রতি একটি অটোরিকশা চুরির সময় চালককে মারধর করে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিল সে।
বর্তমান অবস্থা
সাভার মডেল থানার পরিদর্শক (অপারেশন) মো. হেলাল উদ্দিন জানান, সবুজের বিরুদ্ধে দেশের অন্য কোনো জেলায় অপরাধের রেকর্ড আছে কিনা তা নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বর্তমানে তাকে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে এই ছয়টি হত্যাকাণ্ডের পেছনের মূল রহস্য ও সহযোগীদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।