সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট চট্টগ্রাম জেলা সদর থেকে সাতকানিয়া উপজেলা সদরে স্থানান্তর সংক্রান্ত সাম্প্রতিক প্রজ্ঞাপনকে সারা দেশ এবং চট্টগ্রামের অধিকাংশ আইনজীবী, বিচারপ্রার্থী ও আপামর জনগণ বিপুলভাবে স্বাগত জানিয়েছে।
তবে চট্টগ্রামের আইনজীবী ও নাগরিক সমাজের একাংশের মধ্যে কিছু বিষয়ে উদ্বেগ ও আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে। ন্যায়বিচার, মানবাধিকার এবং আর্থ–সামাজিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতার আলোকে এসব আপত্তি গুরুত্বসহকারে পর্যালোচনার দাবি রাখে।
জেলা সদর থেকে উপজেলা পর্যায়ে আদালত স্থানান্তর নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত পরিবর্তন, যার অভিঘাত বহুমাত্রিক হওয়া স্বাভাবিক। প্রশ্ন হলো—এই পরিবর্তন ন্যায়বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে প্রগতিশীল নাকি পশ্চাদমুখী? এতে প্রকৃত উপকারভোগী কারা, আর কারা তুলনামূলক অসুবিধার সম্মুখীন হবেন? এবং উত্থাপিত অসুবিধাগুলো কতটা যুক্তিসংগত?
উত্থাপিত আপত্তিসমূহ বিশ্লেষণপূর্বক আমার পর্যবেক্ষণ নিম্নরূপ—
➡ হাজতী আসামির ভোগান্তি প্রসঙ্গ
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে সাতকানিয়ায় হাজতী আসামি পরিবহন নতুন কোনো বিষয় নয়। আন্তঃজেলা এমনকি আন্তঃবিভাগ কয়েদি পরিবহন দেশের নিয়মিত প্রশাসনিক বাস্তবতা। বর্তমানে বহু জেলা ও উপজেলায় আদালত অবস্থিত, যেখান থেকে সমপরিমাণ বা আরও দীর্ঘ দূরত্বে হাজতী আসামি আনা–নেওয়া নৈমিত্তিক ঘটনা।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বই হলো নিরাপদ ও মানবিক পরিবহন নিশ্চিত করা। যদি কেবল দূরত্বকেই প্রধান সমস্যা ধরা হয়, তবে দেশের অধিকাংশ জেলা ও উপজেলা আদালতের বৈধতাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।
মূল প্রশ্ন হলো— রাষ্ট্র কি নিরাপত্তা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার অজুহাতে নাগরিকের ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার সংকুচিত করতে পারে? উত্তর স্পষ্টতই না। বরং ফরিয়াদি ও আসামির ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার সহজ করাই মানবাধিকারের মৌলিক দাবি। সুতরাং হাজতী পরিবহন কীভাবে আরও দ্রুত, নিরাপদ ও মানবিক করা যায়— আলোচনা হওয়া উচিত সেই দিকে।
➡ আত্মসমর্পণকারী আসামির প্রসঙ্গ
আইনের দৃষ্টিতে আত্মসমর্পণের উদ্দেশ্য হলো বিচারিক প্রক্রিয়ার সম্মুখীন হওয়া, নির্দিষ্ট কোনো কারাগারে থাকার সুবিধা ভোগ করা নয়। জামিন না হলে কারাগারে প্রেরণ আইনগত পরিণতি; এটি কোনো শাস্তিমূলক হয়রানি নয়। বাস্তবে আদালত নিকটবর্তী হলে আত্মসমর্পণের প্রবণতা বরং বাড়ে, উপজেলা আদালতের পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতাই তার প্রমাণ।
➡ দুর্নীতি ও অতিরিক্ত আর্থিক চাপের আশঙ্কা
উপজেলা পর্যায়ে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট স্থানান্তর হলে দুর্নীতি ও ঘুষ লেনদেন বাড়বে— এমন আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। বাস্তবতা হলো, ঘুষ ও দুর্নীতি দেশের সব সেবা খাতের একটি কাঠামোগত সমস্যা। এর সঙ্গে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই; বরং সম্পর্ক রয়েছে ব্যবস্থাপনা, জবাবদিহিতা ও তদারকির সঙ্গে।
চট্টগ্রাম জেলা আদালত কিংবা রাজধানীকেন্দ্রিক অফিস-আদালতগুলো কি দুর্নীতিমুক্ত? বাস্তবে দেখা যায়, শহরকেন্দ্রিক আদালতগুলোতে দুর্নীতির পরিমাণ ও ঘনত্ব উভয়ই বেশি। টাউট দমনে ব্যর্থতার দায় আদালতের আঞ্চলিক অবস্থানের ওপর চাপানো যুক্তিসংগত নয়।
বরং জেলা সদরকেন্দ্রিক বিচার ব্যবস্থায় মামলা পরিচালনার ব্যয়- যাতায়াত, থাকা, আইনজীবী ফি ও সাক্ষী হাজিরা- অধিকাংশ ক্ষেত্রে বহুগুণ বেশি। উপজেলা সদরে আদালত থাকলে এই ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে, ফলে বিচারপ্রার্থীর সামগ্রিক আর্থিক বোঝা হ্রাস পায়।
➡ স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা
এই আশঙ্কা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অভিযোগটি সত্য হলে দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বিচার ব্যবস্থা এতদিনে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়ত। বাস্তবে, নিম্ন আদালতের বিচারকগণ দেশের অন্যান্য সরকারি সংস্থার তুলনায় স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে তুলনামূলকভাবে স্বাধীনভাবে বিচারিক দায়িত্ব পালন করেন।
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে বিশেষ কিছু রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল মামলায় নির্বাহী বিভাগের চাপ থাকতে পারে। তবে এ ধরনের চাপ সাধারণত টপ-ডাউন প্রক্রিয়ায় ঘটে, আঞ্চলিক বা বটম-আপ প্রভাব হিসেবে নয়। এমনকি অতীতে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিও নির্বাহী হস্তক্ষেপের শিকার হয়েছেন— যা প্রমাণ করে যে সমস্যাটি আদালতের ভৌগোলিক অবস্থান নয়, বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতির।
➡ নথিজনিত জটিলতা ও ‘মিস কেস’ সমস্যা
মিস কেস, নথি তলব, বেইলবন্ড ও জেলখানা সমন্বয় সংক্রান্ত জটিলতা দূরত্বজনিত নয়; এগুলো মূলত দুর্বল প্রশাসনিক সমন্বয়, ডিজিটাল ব্যবস্থার অভাব এবং দায়িত্বহীনতার ফল।
পটিয়া, বাঁশখালী বা সন্দ্বীপের অভিজ্ঞতা যদি তিক্ত হয়ে থাকে, তবে তার শিক্ষা হওয়া উচিত উন্নত পরিকল্পনা ও কার্যকর তদারকি— আদালত বিকেন্দ্রীকরণ বাতিল নয়।
কোর্ট সিস্টেমে ডিজিটাইজেশন, যেমন, e-Case Record, e-Transmission, অনলাইন নথি তলবসহ ই-জুডিসিয়াল সার্ভিস কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দূরত্বজনিত ভোগান্তি, নথি জটিলতা ও ঘুষ-দুর্নীতি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে আদালত ডিজিটাইজেশন আর বিকল্প নয়— এটি অনিবার্য বাস্তবতা।
এই ধারাবাহিকতায় “আদালত কর্তৃক তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার আইন, ২০২০” প্রণীত হয়েছে। এর বাস্তব উদাহরণ হিসেবে চট্টগ্রামে ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছে দেশের প্রথম ই-পারিবারিক আদালত—যা পুরোপুরি পেপারলেস ও ডিজিটাল বিচার ব্যবস্থার পথপ্রদর্শক।
এই ই-পারিবারিক আদালতের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে মামলা রেজিস্ট্রেশন, আইনজীবী নির্বাচন, নথি আপলোড, অনলাইন হাজিরা ও ওটিপি ভেরিফিকেশনসহ সব ডিজিটাল সুবিধা পাওয়া যাবে। ফলে দেশের যেকোনো স্থান থেকেই মামলা দায়ের ও পরিচালনা সম্ভব হবে।
➡ আইনজীবীদের পেশাগত অসুবিধা
একই দিনে একাধিক আদালতে মামলা থাকার বিষয়টি আইনজীবীর পেশাগত সময় ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন; এটি রাষ্ট্রের বিচার কাঠামো নির্ধারণের মানদণ্ড হতে পারে না। বিচার ব্যবস্থা আইনজীবীর সুবিধার জন্য নয়— বিচারপ্রার্থীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য।
আইন পেশা স্বাধীন। কোন আইনজীবী কোথায় পেশা পরিচালনা করবেন— এটি তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কিন্তু বিচারপ্রার্থীর নিকটবর্তী আদালতে দ্রুত ন্যায়বিচার পাওয়া জনগণের সাংবিধানিক অধিকার।
➡ মুন্সি নির্ভরতা ও দক্ষ আইনজীবীর অভাব প্রসঙ্গ
এটি আদালত বিকেন্দ্রীকরণের ফল নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে বিচার ব্যবস্থা জেলা শহরে কেন্দ্রীভূত থাকার পরিণতি। উপজেলা পর্যায়ে আদালত প্রতিষ্ঠা হলে বরং স্থানীয় আইনজীবীদের দক্ষতা ও বিচারিক মান বৃদ্ধি পায়— যা অতীত অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত।
দেশে বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর শত শত শিক্ষার্থী আইনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বের হয়ে বিভিন্ন জেলা- উপজেলায় আইনপেশায় যুক্ত হচ্ছে। উপজেলা পর্যায়ে আদালত বিকেন্দ্রীকরণ হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের উচ্চতর ডিগ্রিধারী তরুণ মেধাবী আইনজীবীরা নিজ উপজেলার আদালতমুখী হবে। মুন্সী নির্ভর আইন পেশার প্রাসঙ্গিকতা ও প্রয়োজনীয়তা তখন আর থাকবে না। বিকেন্দ্রীকরণের ফলে স্থানীয় আইনজীবীদের পেশাগত বিকাশ ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ সৃষ্টি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে বিচার ব্যবস্থার জন্য ইতিবাচক।
➡ সাতকানিয়া আদালতের অবকাঠামো সমস্যা
এই সমস্যা বাস্তব হলেও সমাধানপ্রক্রিয়া চলমান। সাতকানিয়ায় দুটি ম্যাজিস্ট্রেট আদালত নির্মাণে ১ কোটি ২৯ লক্ষ টাকা এবং রেকর্ড রুম নির্মাণে ২০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সংস্কার ও নির্মাণকাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। অন্যান্য লজিস্টিক্যাল সমস্যার সমাধানও রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছা, বাজেট বরাদ্দ ও সাতকানিয়া-লোহাগাড়ার শুভানুধ্যায়ীদের সহযোগিতায় সম্ভব।
➡ সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে তুলনার অসংগতি
“চট্টগ্রাম থেকে ৩০০ কিমি দূরে সুপ্রিম কোর্টে যেতে পারলে সাতকানিয়ার মানুষ ৬১ কিমি যেতে পারবে না কেন”— এই যুক্তি আবেগপ্রবণ হলেও যুক্তিগতভাবে ভ্রান্ত।
সুপ্রিম কোর্ট একটি কেন্দ্রীয় ও ব্যতিক্রমধর্মী প্রতিষ্ঠান। সেখানে যাওয়া দৈনন্দিন নয়, বিশেষ পরিস্থিতিনির্ভর। অপরদিকে ম্যাজিস্ট্রেট আদালত সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচারের প্রথম ও প্রধান প্রবেশদ্বার। একজন দরিদ্র মানুষের জন্য প্রতিদিনের বিচারিক কার্যক্রম ৬০–৭০ কিমি দূরে কেন্দ্রীভূত রাখা ন্যায়বিচারের বিকেন্দ্রীকরণ নীতির পরিপন্থী। এক খাতে দুর্ভোগ বিদ্যমান বলেই আরেক খাতে দুর্ভোগ বজায় রাখা ন্যায়সঙ্গত হতে পারে না।
➡ প্রজ্ঞাপন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা
সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত স্থানান্তর সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ কর্তৃক Code of Criminal Procedure, 1898-এর section 11(2A) অনুযায়ী জারি করা হয়েছে।
যদিও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫ প্রণীত হয়েছে, বাস্তবে সচিবালয়ের কার্যক্রম এখনও শুরু হয়নি। অধ্যাদেশের ধারা ১(২) ও ৭ অনুযায়ী গেজেট প্রকাশের আগে সচিবালয় কার্যক্রম শুরু হওয়ার সুযোগ নেই। ফলে সচিবালয় কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত আইন মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ার বহাল রয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে কোনো আইনগত ব্যত্যয় ঘটেনি।
শেষ কথা হচ্ছে, উপজেলা পর্যায়ে আদালত বিকেন্দ্রীকরণ কোনো “রোমান্টিক চিন্তা” নয়। এটি আইনের শাসন, ন্যায়বিচারের প্রবেশগম্যতা এবং বিচার বিভাগের মর্যাদা রক্ষার সাংবিধানিক অঙ্গীকার।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সুপারিশেও উপজেলা পর্যায়ে সিভিল ও ক্রিমিনাল কোর্ট বিকেন্দ্রীকরণ এবং বিভাগীয় পর্যায়ে হাইকোর্ট বেঞ্চ স্থাপনের কথা বলা হয়েছে— যাতে রাজনৈতিক ঐকমত্যও গড়ে উঠেছে।
সাতকানিয়া–লোহাগাড়া ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট স্থানান্তর সেই সংস্কার প্রক্রিয়ারই একটি বাস্তব পদক্ষেপ।
এই যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ ও সার্বিক সহযোগিতার জন্য আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এর মাননীয় উপদেষ্টা Dr. Asif Nazrul স্যার, সাতকানিয়ার কৃতি সন্তান, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন মহোদয়, আইন ও বিচার বিভাগ এর সচিব মহোদয়, চট্টগ্রামের মাননীয় জেলা জজ মহোদয়, আইন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব আশেকুর রহমান, সাতকানিয়ার বিজ্ঞ যুগ্ম জেলা জজ Shaheen Siraj ও অন্যান্য বিজ্ঞ বিচারকবৃন্দ, সাতকানিয়া আইনজীবী সমিতির সম্মানিত নেতৃবৃন্দসহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।