জিততে জিততে হেরে গেলেন সারজিস আলম
বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, পঞ্চগড়: ভোটের ফল ঘোষণার পর থেকেই থমথমে কিন্তু এক অন্যরকম আবেগে ভাসছে হিমালয় কন্যা পঞ্চগড়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পঞ্চগড়-১ আসনে লড়াইটা ছিল সমানে সমান। নির্বাচনের শুরু থেকেই আলোচনায় ছিলেন জুলাই বিপ্লবের অন্যতম অগ্রনায়ক সারজিস আলম।
শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় মাত্র ৮ হাজার ১২০ ভোটের ব্যবধানে হারলেও, স্থানীয়দের ভাষায়— “সারজিস হারেননি, তিনি মানুষের মন জয় করেছেন।”
লড়াইয়ের ময়দান ও ফলাফল
নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত ফলাফল অনুযায়ী, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রার্থী ব্যারিস্টার নওশাদ জমির পেয়েছেন ১,৭৬,১৬৯ ভোট। অন্যদিকে, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ‘শাপলা কলি’ প্রতীক নিয়ে সারজিস আলম পেয়েছেন ১,৬৮,০৪৯ ভোট।
ভোটের ব্যবধান সামান্য হলেও দিনভর কেন্দ্রগুলোতে সারজিসের সমর্থকদের জোয়ার দেখে অনেকেই মনে করেছিলেন পঞ্চগড়ে নতুন ইতিহাস তৈরি হতে যাচ্ছে।
কেন হলো এই স্বপ্নভঙ্গ? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ব্যবচ্ছেদ
সারজিস আলম এক বিশাল ভোট ব্যাংক তৈরি করলেও কেন শেষ পর্যন্ত জয়ের বন্দরে পৌঁছাতে পারলেন না, তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন বিশেষজ্ঞরা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর পরাজয়ের পেছনে বেশ কিছু কৌশলগত কারণ ও নেতিবাচক প্রভাব কাজ করেছে:
রাজনৈতিক অনভিজ্ঞতা ও অতিকথন: রাজপথ আর সংসদীয় রাজনীতির সমীকরণ যে ভিন্ন, তা সারজিস আলমের ক্ষেত্রে ফুটে উঠেছে। দীর্ঘদিনের পোড়খাওয়া রাজনীতিকদের মোকাবিলায় তাঁর অভিজ্ঞতার অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। এছাড়া বক্তৃতায় পরিমিতিবোধের অভাব ও ‘অতিকথন’ সাধারণ ভোটারদের একটি অংশকে দূরে ঠেলে দিয়েছে।
আক্রমণাত্মক ভঙ্গি ও তারেক রহমান প্রসঙ্গ: নির্বাচনের প্রচারণার সময় বিএনপির সর্বোচ্চ নেতা তারেক রহমান সম্পর্কে নেতিবাচক ও আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহারের বিষয়টি বুমেরাং হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এতে পঞ্চগড়ের বিশাল একটি জনগোষ্ঠী, যারা দীর্ঘকাল ধরে বিএনপির সমর্থক, তাদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির সাথে কৌশলগত মেলবন্ধন: স্বাধীনতার মুক্তাঞ্চল হিসেবে পরিচিত পঞ্চগড়ে তথাকথিত স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির সাথে জোট বেঁধে নির্বাচন করার বিষয়টি সচেতন ভোটারদের অনেকেই সহজভাবে নিতে পারেননি। এটি তাঁর স্বচ্ছ ও বিপ্লবী ভাবমূর্তিতে কিছুটা আঘাত হেনেছে।
সাংগঠনিক লড়াইয়ে সীমাবদ্ধতা: ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তায় এগিয়ে থাকলেও সাংগঠনিক শক্তির লড়াইয়ে এনসিপি খুব একটা দাপট দেখাতে পারেনি। নিজের ওপর মাত্রাতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এবং প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মাত্রাতিরিক্ত ‘যুদ্ধংদেহী আক্রমণাত্মক বক্তব্য’ সাধারণ ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের বিরক্তি তৈরি করেছিল বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
কে এই সারজিস আলম?
পঞ্চগড়ের সন্তান সারজিস আলমের উত্থান মেধা আর সাহসের সংমিশ্রণে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র সারজিস সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে ছিলেন পরিচিত মুখ। অমর একুশে হলের আবাসিক ছাত্র হিসেবে তিনি ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনেও সক্রিয় ছিলেন।
তবে তার দেশব্যাপী পরিচিতি আসে ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং পরবর্তীকালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হিসেবে।
স্বৈরাচার পতনের সেই অকুতোভয় সেনানী
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের উত্তাল দিনগুলোতে আওয়ামী লীগ সরকারের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া আন্দোলনে সারজিস আলম ছিলেন প্রথম সারির যোদ্ধা।
ডিবি কার্যালয়ে রিমান্ড: আন্দোলনের সময় ডিবি কার্যালয়ে তুলে নিয়ে গিয়ে জোর করে বিবৃতি আদায়ের চেষ্টা করা হলেও তিনি নতি স্বীকার করেননি।
রাজপথের আপসহীন নেতৃত্ব: শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি সমন্বয়ক হিসেবে ঢাকাসহ সারা দেশের ছাত্র-জনতাকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ৫ই আগস্টের ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর রাষ্ট্র সংস্কারের ডাক দিয়ে তিনি নতুন রাজনৈতিক দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’র হয়ে নির্বাচনী লড়াইয়ে নামেন।
“জিততে জিততে হেরে যাওয়া”: সরেজমিনে পঞ্চগড়
পঞ্চগড় সদরের ধাক্কামারা মোড়ে চায়ের কাপে এখনও নির্বাচনী ঝড়। সেখানকার ষাটোর্ধ্ব আমজাদ হোসেন বলেন,”বাবা, ভোট তো আমরা দুজনেই দেখছি। সারজিস পোলাটা আমাগো ঘরের ছেলে। বড় দল না হয়েও ও একাই কপাল পুড়াই দিছে বড় বড় নেতাদের। শেষ পর্যন্ত জিততে পারলো না, কিন্তু ও যে এতো ভোট পাইলো—এটাই ওর বড় জয়।”
তেঁতুলিয়ার স্থানীয় তরুণ ভোটার শরিফুল ইসলাম বলেন,”আমরা পরিবর্তন চেয়েছিলাম। সারজিস ভাই আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়। তিনি হেরে গেলেও আমরা তাকে হারানো নেতা মনে করি না। তিনি আমাদের পঞ্চগড়ের গর্ব।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কোনো বড় রাজনৈতিক জোটের সমর্থন ছাড়া একজন তরুণ প্রার্থীর ১ লাখ ৬৮ হাজার ভোট পাওয়া এ দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে বিরল। মূলত আওয়ামী লীগ সরকার হঠানোর আন্দোলনে তার ত্যাগ এবং স্বচ্ছ ভাবমূর্তির কারণেই সাধারণ মানুষ তাকে দুই হাত ভরে ভোট দিয়েছেন।
আগামীর সম্ভাবনা
নির্বাচনে পরাজয় মেনে নিয়ে সারজিস আলম তার প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন, তিনি পঞ্চগড়ের মানুষের পাশেই থাকবেন এবং রাষ্ট্র সংস্কারের যে স্বপ্ন নিয়ে আন্দোলনে নেমেছিলেন, তা সংসদীয় রাজনীতির বাইরে থেকেও চালিয়ে যাবেন।
আমাদের কন্টেন্টগুলো ভালো লাগলে এবং পরবর্তী আপডেট পেতে ফলো করুন ও মন্তব্য করুন: businesstoday24.com










