Home First Lead সাগরের তলে বনায়ন: প্রবাল ও কচ্ছপ ফেরাতে অভিনব উদ্যোগ

সাগরের তলে বনায়ন: প্রবাল ও কচ্ছপ ফেরাতে অভিনব উদ্যোগ

‘বাঁচবে প্রবাল, বাঁচবে দ্বীপ: সেন্ট মার্টিনের আগামীর রূপরেখা’
পর্ব-৪


 কামরুল  ইসলাম, ঢাকা: মাটির ওপরে গাছ লাগানোর কথা আমরা সবাই জানি, কিন্তু সাগরের তলদেশে বনায়ন? শুনতে অবাক লাগলেও সেন্ট মার্টিন দ্বীপকে বাঁচাতে এমনই এক অভিনব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ‘মাস্টার প্ল্যান: সেন্ট মার্টিন দ্বীপ (সেপ্টেম্বর ২০২৫)’-এ দ্বীপের প্রাণভোমরা—‘প্রবাল’ এবং ‘সামুদ্রিক কচ্ছপ’ রক্ষায় বিজ্ঞানভিত্তিক এক মহাযজ্ঞের প্রস্তাব করা হয়েছে।

দ্বীপের অস্তিত্ব মূলত টিকে আছে এই প্রবাল প্রাচীরের ওপরই। কিন্তু নোঙরের আঘাত, পলিমাটি জমা হওয়া এবং পানির তাপমাত্রা বাড়ার কারণে প্রবালগুলো সাদা হয়ে মরে যাচ্ছে । পরিবেশ অধিদপ্তরের এই মহাপরিকল্পনায় মৃতপ্রায় এই প্রবাল ফিরিয়ে আনতে এবং কচ্ছপের প্রজনন নিশ্চিত করতে নেওয়া হয়েছে ‘প্রবাল পুনরুদ্ধার’ ও ‘কচ্ছপ সংরক্ষণ’ প্রকল্প।

সাগরের তলে ‘নার্সারি’ ও কৃত্রিম প্রবাল
মাস্টার প্ল্যানের প্রজেক্ট কোড CR-01 অনুযায়ী, প্রবাল পুনরুদ্ধারের জন্য ৫০ মিলিয়ন টাকা (৫ কোটি টাকা) বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় সাগরের নিচে ‘কোরাল নার্সারি’ তৈরি করা হবে।
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, ল্যাবরেটরি বা সংরক্ষিত এলাকায় প্রবালের ছোট অংশ (Coral Fragments) বড় করা হবে। এরপর সেগুলোকে সাগরের নির্দিষ্ট স্থানে পাথর বা কৃত্রিম কাঠামোর ওপর প্রতিস্থাপন করা হবে। বিশেষ করে ‘পোকাইটাস’, ‘ফ্যাভাইটিস’ এবং ‘অ্যাক্রোপোরা’র মতো শক্ত প্রবালগুলো—যা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করতে পারে—সেগুলোর বংশবিস্তারে জোর দেওয়া হবে।

সহজ কথায়, একে বলা হচ্ছে ‘সাগরের তলে বনায়ন’। পরিবেশ অধিদপ্তর আশা করছে, এই কৃত্রিম রিফ বা প্রাচীর মাছের আবাসস্থল বাড়াবে এবং দ্বীপের ভাঙন রোধ করবে।

জাহাজের নোঙর: প্রবালের যম
পর্যটকবাহী জাহাজ এবং ট্রলারগুলোর লোহার ভারী নোঙর যখন সাগরের নিচে ফেলা হয়, তখন তা প্রবাল ভেঙে চুরমার করে দেয়। মহাপরিকল্পনায় এই ধ্বংসলীলা থামাতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এখন থেকে জাহাজগুলো যেখানে-সেখানে নোঙর করতে পারবে না। সাগরের নির্দিষ্ট স্থানে ভাসমান বয়া (Mooring Buoys) স্থাপন করা হবে। জাহাজগুলো সেই বয়ার সাথে রশি দিয়ে বাঁধা থাকবে, কোনোভাবেই নোঙর মাটিতে ফেলা যাবে না।

কচ্ছপের জন্য ‘অন্ধকার’ জোন
সেন্ট মার্টিন হলো জলপাই রঙের কাছিম এবং সবুজ কচ্ছপের  প্রিয় প্রজননক্ষেত্র। কিন্তু সৈকতে রিসোর্টের ঝলমলে আলো এবং পর্যটকদের কোলাহলে কচ্ছপরা আর ডিম পাড়তে আসছে না।

মাস্টার প্ল্যানের প্রজেক্ট TC-01TC-02-এর আওতায় কচ্ছপ রক্ষায় ৬ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এর প্রধান দিকগুলো হলো:
১. আলো নিয়ন্ত্রণ: সৈকত সংলগ্ন হোটেলগুলোর আলো যাতে সৈকতে না পড়ে, সেজন্য বিশেষ পর্দা বা কম আলোর ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হবে।
২. নিরাপদ প্রজনন ক্ষেত্র: পশ্চিম সৈকত এবং ছেঁড়া দ্বীপের বালুময় এলাকাকে কচ্ছপের জন্য ‘সংরক্ষিত’ ঘোষণা করা হবে। প্রজনন মৌসুমে (শীতকালে) রাতে সেখানে পর্যটকদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে।

কুকুর আতঙ্ক ও সমাধান
দ্বীপের কচ্ছপদের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে বেওয়ারিশ কুকুর। এরা সৈকতের বালু খুঁড়ে কচ্ছপের ডিম খেয়ে ফেলে। মাস্টর প্ল্যানের তথ্যমতে, দ্বীপে প্রায় ৩,৩০০ থেকে ৪,৫০০টি কুকুর রয়েছে।
পরিকল্পনায় কুকুর নিধন না করে তাদের জন্মনিয়ন্ত্রণ (বন্ধ্যাকরণ) এবং টিকাদানের মাধ্যমে সংখ্যা কমিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া কচ্ছপের ডিম পাড়ার জায়গাগুলো বিশেষ জালের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

গবেষণা ও মনিটরিং
এই পুরো কর্মযজ্ঞ সফল করতে বাংলাদেশ ওশেনোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট এবং মেরিটাইম ইনস্টিটিউটগুলোকে যুক্ত করা হয়েছে। তারা নিয়মিত সাগরের পানির গুণমান এবং প্রবালের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করবে।

আগামীর স্বপ্ন
পরিবেশবিদরা বলছেন, প্রবাল কেবল পাথর নয়, এটি একটি জীবন্ত প্রাণী। মাস্টার প্ল্যানের এই উদ্যোগ যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে আগামী ৫-১০ বছরের মধ্যে সেন্ট মার্টিনের তলদেশ আবার রঙিন হয়ে উঠবে। ফিরে আসবে সেই বর্ণিল মাছ আর কচ্ছপের দল, যা সেন্ট মার্টিনকে করেছিল অনন্য।

লাইক দিন 👍, শেয়ার করুন 🔁, এবং মন্তব্যে জানান আপনার মতামত!