মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উত্তাপ আর মার্কিন ডলারের অস্বাভাবিক শক্তিশালী অবস্থানে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দামে নজিরবিহীন পতন ঘটেছে। শনিবার লেনদেন শেষে দেখা যায়, নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে পরিচিত এই ধাতুর দাম প্রতি আউন্সে বড় ব্যবধানে কমেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৮৩ সালের পর এক সপ্তাহের ব্যবধানে এটিই সোনার দামের সবচেয়ে বড় পতন।
পতনের চিত্র: সোনা ও রুপার বাজার
আন্তর্জাতিক বাজার (COMEX)-এ সোনার ফিউচারস প্রাইস প্রায় ২.৪৭ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪,৫০০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে। স্পট গোল্ডের দামও ১.৮ শতাংশ কমে বর্তমানে ৪,৫৬৩.৬৪ ডলারে অবস্থান করছে।
একই অবস্থা রুপার বাজারেও। একদিনেই রুপার দাম প্রায় ৫ শতাংশ ধসে পড়ে প্রতি আউন্স ৭০ ডলারের নিচে (বর্তমানে ৬৯.৩৯ ডলার) নেমে এসেছে। গত কয়েক মাস আগে রুপার দাম যেখানে প্রতি আউন্স ১১৯ ডলারে উঠেছিল, সেখান থেকে এই পতন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।
দাম কমার নেপথ্যে ৩টি প্রধান কারণ
সাধারণত যুদ্ধ বা রাজনৈতিক অস্থিরতায় সোনার দাম বাড়লেও এবারের চিত্র ভিন্ন। এর পেছনে বিশেষজ্ঞরা ৩টি কারণ চিহ্নিত করেছেন:
শক্তিশালী মার্কিন ডলার ও ট্রেজারি ইল্ড: রয়টার্সের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা অতিরিক্ত সৈন্য মোতায়েন করছে—এমন খবরে ডলারের মান ও মার্কিন ট্রেজারি ইল্ড বেড়ে গেছে। ডলার শক্তিশালী হওয়ায় অন্যান্য মুদ্রার অধিকারীদের জন্য সোনা কেনা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে।
সুদের হার বৃদ্ধির আশঙ্কা: মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ, ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং ব্যাংক অফ ইংল্যান্ড মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এপ্রিলের শুরুতেই সুদের হার বাড়াতে পারে। উচ্চ সুদের হার সাধারণত সোনার মতো ‘নন-ইল্ডিং’ সম্পদের আকর্ষণ কমিয়ে দেয়।
জ্বালানি সংকট ও মুদ্রাস্ফীতি: ইরান-আমেরিকা যুদ্ধের ফলে হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কায় তেলের দাম বাড়ছে। দীর্ঘমেয়াদী উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি এড়াতে সোনা বিক্রি করে নগদ টাকা (Sell-off) হাতে রাখছেন।
বিশ্লেষকদের অভিমত: ১৯৮৩ সালের সেই ‘বাবল’ কি ফিরছে?
বাজার বিশ্লেষক তাই ওয়াং জানান, “বিনিয়োগকারীরা সাপ্তাহিক ছুটির আগে এক ধরণের অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। সুদের হার বৃদ্ধির ভয় এবং যুদ্ধের অনিশ্চয়তা সোনা ও রুপার বাজারকে অস্থির করে তুলেছে।”
অনেকে বর্তমান পরিস্থিতির সাথে ১৯৭৯-৮০ সালের ঘটনার তুলনা করছেন। সে সময় ইরানি বিপ্লবের প্রভাবে সোনার দাম আউন্স প্রতি ৮৫০ ডলার ছাড়িয়েছিল, কিন্তু ১৯৮৩ সালে সেই ‘প্রাইস বাবল’ ফেটে গিয়ে দাম এক ধাক্কায় ২০ শতাংশ কমে ৪০০ ডলারে নেমে আসে। বর্তমানের এই পতনকেও অনেকে বড় ধরণের ‘মার্কেট কারেকশন’ বা বাজার সংশোধন হিসেবে দেখছেন।
ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস: দাম কি আরও কমবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্পমেয়াদে সোনার দামে আরও কিছুটা পতন হতে পারে এবং বাজার বেশ ‘বাম্পি’ বা অস্থিতিশীল থাকবে। তবে ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হলে দাম একেবারে তলানিতে নামার সম্ভাবনা কম। আপাতত বিনিয়োগকারীরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছেন।