আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মরুভূমির বুকে মরীচিকার মতো আধুনিক শহর গড়ার স্বপ্ন নিয়ে শুরু হওয়া সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’ প্রকল্প এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। তেলের আন্তর্জাতিক দাম ক্রমাগত কমতে থাকায় সৌদি সরকার তাদের বিশাল বাজেটের প্রকল্পগুলোতে ‘ব্রেক’ কষতে বাধ্য হচ্ছে।
১. মুখাব (Mukaab): থমকে গেছে বিশালাকার সেই ঘনক
রাজধানী রিয়াদের কেন্দ্রস্থলে নির্মাণের অপেক্ষায় থাকা ৪০০ মিটার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতার ঘনক আকৃতির ভবন ‘মুখাব’-এর কাজ আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। যেখানে ২০টি এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং অনায়াসে ধরে যাওয়ার কথা ছিল, সেখানে প্রাথমিক খনন কাজের পর আর কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পের সমাপ্তির লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০ সাল থেকে পিছিয়ে ২০৪০ সালে নির্ধারণ করা হয়েছে।
২. নিওম ও দ্য লাইন (The Line): আমূল পরিবর্তনের পথে
ভিশন ২০৩০-এর মুকুট হিসেবে পরিচিত ১৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ রৈখিক শহর ‘দ্য লাইন’ এখন নতুন করে ডিজাইন করা হচ্ছে। তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৯০-১১০ ডলার থাকলে যা সম্ভব ছিল, এখন ৬০ ডলারের বাজারে তা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে ১৭০ কিলোমিটারের স্বপ্নকে অনেক কমিয়ে আনা হচ্ছে। এছাড়া ২০২৯ সালের উইন্টার এশিয়ান গেমস আয়োজনের পরিকল্পনাও অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে।
৩. কারণ যখন তেলের দাম ও বাজেট ঘাটতি
সৌদি আরবের জাতীয় বাজেটের ভারসাম্য রক্ষার জন্য তেলের দাম ব্যারেল প্রতি অন্তত ৯০-১১০ ডলার হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে তা ৬০ ডলারের ঘরে নেমে আসায় দেশটির জিডিপি ঘাটতি ৫ শতাংশে পৌঁছেছে। এ কারণে মেগা প্রজেক্টগুলোই এখন প্রথম কাটছাঁটের তালিকায় পড়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের চাপ এবং ওপেক (OPEC) প্লাসের উৎপাদন বৃদ্ধির সিদ্ধান্তও তেলের দাম কমাতে ভূমিকা রেখেছে।
৪. ধনকুবেরদের ডাকছে সৌদি আরব
আর্থিক চাপ সামলাতে এবং বিদেশী বিনিয়োগ টানতে সৌদি আরব এখন ‘গোল্ডেন ভিসা’ বা প্রিমিয়াম রেসিডেন্সি কার্ডের দিকে ঝুঁকছে। যাদের নিট সম্পদের পরিমাণ ৩০ মিলিয়ন ডলারের বেশি কিংবা যারা বিলাসবহুল সুপার-ইয়টের মালিক, তাদের জন্য বিশেষ নাগরিক সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই—বিদেশে চলে যাওয়া পুঁজি আবার সৌদিতে ফিরিয়ে আনা।
৫. সংকটে বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও নির্মাণ খাত
সৌদি আরবের এই প্রকল্প স্থবিরতার প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক নির্মাণ বাজারেও। দক্ষিণ কোরিয়ার নির্মাণ সংস্থাগুলোর অর্ডার গত বছরের তুলনায় ২০% কমে গেছে। ঠিক একইভাবে, সৌদিতে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিক এবং সরবরাহ চেইনগুলোর ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অনেক সিমেন্ট প্ল্যান্ট এবং রেডি-মিক্স কনক্রিট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যেই তাদের কার্যক্রম কমিয়ে দিয়েছে।
সৌদি আরবের এই ‘ধীরে চলো’ নীতি প্রমাণ করে যে, তেলের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসার পথটি যতটা সহজ ভাবা হয়েছিল, বাস্তবে তা অনেক বেশি বন্ধুর।
businesstoday24.com-কে ফলো করুন এবং আপনার মূল্যবান মন্তব্য নিচে শেয়ার করুন। মেগা প্রজেক্টের এই স্থবিরতা কি সৌদি আরবের অর্থনীতিতে বড় কোনো প্রভাব ফেলবে? আপনার মতামত আমাদের জানান।