Home Third Lead স্টেইনলেস স্টিল কিনছেন নাকি চকচকে লোহা?

স্টেইনলেস স্টিল কিনছেন নাকি চকচকে লোহা?

স্টিলের উজ্জ্বলতায় মরচে ধরা জালিয়াতি

পকেটে সিঁধ: ভোক্তার প্রতিদিনের লড়াই 

কামরুল হাসান
গৃহস্থালী কাজে মাটির বা অ্যালুমিনিয়ামের বদলে এখন স্টেইনলেস স্টিলের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। আমরা মনে করি স্টিল মানেই তা আজীবন চকচকে থাকবে এবং মরচে ধরবে না। কিন্তু বাজারের অধিকাংশ সস্তা স্টিল সামগ্রী আসলে ‘নন-গ্রেডেড’ লোহা বা স্ক্র্যাপ লোহা দিয়ে তৈরি, যার ওপর নিকেলের একটি পাতলা প্রলেপ দেওয়া থাকে। এই ‘স্টিল-জালিয়াতি’ কেবল আপনার টাকা নষ্ট করছে না, বরং রান্নার সময় খাবারের সাথে বিষাক্ত ধাতু মিশিয়ে দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
বিজনেসটুডে২৪-এর অনুসন্ধানে স্টিল সামগ্রী তৈরির নেপথ্যের কিছু জালিয়াতি বেরিয়ে এসেছে।
স্টিল সামগ্রীর বাজারে যেভাবে চলে ‘ধাতব’ জালিয়াতি
১. গ্রেড জালিয়াতি (২০২ বনাম ৩০৪ গ্রেড): খাবারের নিরাপদ পাত্রের জন্য আদর্শ হলো ‘৩০৪ গ্রেড’ স্টেইনলেস স্টিল। কিন্তু বাজারে অধিকাংশ থালা-বাসন তৈরি হয় নিম্নমানের ‘২০২ গ্রেড’ বা তার চেয়েও খারাপ ধাতু দিয়ে। এই স্টিলে ম্যাঙ্গানিজের পরিমাণ বেশি থাকে, যা ধীরে ধীরে খাবারের সাথে মিশে যায়। বিক্রেতারা সব স্টিলকেই ‘খাঁটি বা ফুড গ্রেড’ বলে চড়া দামে বিক্রি করে।
২. ম্যাগনেট বা চুম্বক জালিয়াতি: আসল স্টেইনলেস স্টিলে চুম্বক লাগার কথা নয়। কিন্তু অনেক সময় স্টিলের পাতে এমন কিছু কেমিক্যাল কোটিং দেওয়া হয় যাতে লোহা থাকলেও চুম্বক ধরে না। সাধারণ ক্রেতারা চুম্বক দিয়ে পরীক্ষা করে আশ্বস্ত হন, কিন্তু কিছুদিন ব্যবহারের পরই ওপরের পালিশ উঠে গিয়ে নিচ থেকে মরচে বেরিয়ে আসে।
৩. ওজন ও পুরুত্বে কারচুপি (Gauge Deception): স্টিল সামগ্রীর স্থায়িত্ব নির্ভর করে এর পুরুত্বের ওপর। অনেক সময় হাঁড়ি বা জগের নিচের অংশ (Bottom) ভারি করার জন্য ভেতরে বালু বা সস্তা লোহা ঢুকিয়ে সিল করে দেওয়া হয়। এতে হাতে নিলে ভারি মনে হলেও রান্নার সময় নিচের অংশ দ্রুত পুড়ে যায় বা ফেটে যায়।
৪. রি-রোলিং স্ক্র্যাপের ব্যবহার: পুরনো জাহাজ ভাঙা লোহা বা পরিত্যক্ত স্ক্র্যাপ গলিয়ে সরাসরি স্টিলের পাত তৈরি করা হয়। এসব ধাতুতে আর্সেনিক বা সীসার মতো ভারী ধাতু মিশ্রিত থাকে। এসব পাত দিয়ে তৈরি চামচ বা বাটি ব্যবহারে মানবদেহে বিষক্রিয়া হতে পারে।
অনুসন্ধান ও অভিযানে ধরা পড়া বাস্তব চিত্র:
পুরান ঢাকার কারখানাগুলোতে হানা: চকবাজার ও লালবাগ এলাকার বেশ কিছু কারখানায় অভিযানে দেখা গেছে, তারা অতি নিম্নমানের লোহার চাদরে অ্যাসিড দিয়ে ওয়াশ করে নামী ব্র্যান্ডের সিল মেরে দিচ্ছে।
বিএসটিআই-এর পর্যবেক্ষণ: বিএসটিআই-এর ল্যাব টেস্টে দেখা গেছে, বাজারে প্রচলিত অন্তত ৩৫ শতাংশ স্টিল সামগ্রী ‘ফুড গ্রেড’ নয় এবং এগুলো এসিডিক খাবারের (যেমন- লেবু বা টক) সংস্পর্শে এলে বিক্রিয়া করে ক্ষতিকর রাসায়নিক তৈরি করে।
বিদেশে রপ্তানির নামে প্রতারণা: অনেক সময় ‘এক্সপোর্ট কোয়ালিটি’ স্টিকার লাগিয়ে সাধারণ মানের স্টিল ফুটপাতে বা ভ্যানে করে বিক্রি করা হয়। লোগো ও ফিনিশিং দেখে বোঝার উপায় থাকে না যে এটি কয়েকদিন পরেই কালো হয়ে যাবে।
স্টিল সামগ্রী কেনার সময় সচেতনতায় যা করবেন:
গ্রেড নম্বর যাচাই: ভালো মানের স্টিল সামগ্রীর নিচে খোদাই করে ‘SS 304′ বা ’18/8’ (১৮% ক্রোমিয়াম ও ৮% নিকেল) লেখা থাকে। কেবল ‘Stainless Steel’ লেখা থাকলে সেটি এড়িয়ে চলাই ভালো।
রঙ ও ফিনিশিং: ভালো স্টিলের উজ্জ্বলতা কিছুটা রুপালি বা সাদার মতো হবে। যদি স্টিল খুব বেশি চকচকে বা নীলচে আভা দেয়, তবে বুঝবেন এতে নিকেলের অতিরিক্ত প্রলেপ দেওয়া হয়েছে যা দ্রুত উঠে যাবে।
ওজন ও জোড়া পর্যবেক্ষণ: জগ বা কেটলির হাতল যেখানে জোড়া দেওয়া হয়েছে, সেখানে কোনো সূক্ষ্ম ফাটল বা ছিদ্র আছে কি না দেখুন। নিম্নমানের স্টিলের জোড়াগুলো অমসৃণ হয়।
লেবুর রস পরীক্ষা: একটি নতুন স্টিলের বাটিতে সামান্য লেবুর রস দিয়ে কিছুক্ষণ রাখুন। যদি সেই জায়গাটি কালো হয়ে যায় বা ধাতব গন্ধ বের হয়, তবে বুঝবেন সেটি নিম্নমানের ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
সতর্কতা:
রান্নাঘরের পাত্র মানে আপনার পরিবারের স্বাস্থ্য। সস্তায় চকচকে বাসন কিনে রোগব্যাধি ডেকে আনবেন না। কোনো দোকানদার যদি স্টিলের নামে লোহা গছিয়ে দেয়, তবে প্রমাণসহ ভোক্তা অধিকারের হটলাইন ১৬১২১ নম্বরে অভিযোগ জানান।