Home Third Lead আগামীর বাংলাদেশ: নাগরিক হবে যখন স্মার্ট উদ্ভাবক

আগামীর বাংলাদেশ: নাগরিক হবে যখন স্মার্ট উদ্ভাবক

পর্ব-১

বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে বিশ্ব এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের (4IR) দোরগোড়ায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), রোবটিক্স এবং ইন্টারনেট অব থিংসের (IoT) মতো প্রযুক্তিগুলো যখন বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জীবনযাত্রাকে আমূল বদলে দিচ্ছে, তখন বাংলাদেশকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার রূপরেখা তৈরি হচ্ছে। এই রূপান্তরের কেন্দ্রে রয়েছে শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন—বিশেষ করে STEM (বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত) থেকে STEAM (শিল্পকলাসহ) মডেলে উত্তরণ।
সম্প্রতি এক নিবন্ধে STEMX365-এর প্রতিষ্ঠাতা ও এমআইটি (MIT)-র বিজ্ঞানী মিজানুল এইচ চৌধুরী এবং সিইউইটি, রুয়েট ও ইউএসটিসি-র সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শিক্ষা মডেল নিয়ে এক যুগান্তকারী পথনকশা তুলে ধরেছেন। তাদের মতে, স্মার্ট ফিউচার বাংলাদেশ বিনির্মাণে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত ‘দেখা-করা-শেখা’ (Seeing-Doing-Learning) পদ্ধতির কোনো বিকল্প নেই।
২০৪১-এর লক্ষ্য ও স্মার্ট ফিউচার বাংলাদেশ
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘স্মার্ট ফিউচার বাংলাদেশ’ কেবল একটি স্লোগান নয়, এটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের একটি ধারণা। ২০৪১ সালের মধ্যে উচ্চ আয়ের দেশ হওয়ার লক্ষ্যে মাথাপিছু জিডিপি ১২,৫০০ ডলারে উন্নীত করা, চরম দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং সরকারি সেবাকে শতভাগ কাগজবিহীন ও নগদবিহীন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে চারটি প্রধান স্তম্ভ—স্মার্ট নাগরিক, স্মার্ট সরকার, স্মার্ট অর্থনীতি এবং স্মার্ট সমাজ গঠনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
STEM থেকে STEAM: কেন এই পরিবর্তন?
বিজ্ঞানীরা বলছেন, শুধু তথ্য মুখস্থ করার দিন শেষ। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের বাজারে টিকে থাকতে হলে শিক্ষার্থীদের সমালোচনামূলক চিন্তা, উদ্ভাবন এবং দলগত কাজের দক্ষতা অর্জন করতে হবে। প্রথাগত STEM শিক্ষার সাথে ‘Arts’ বা শিল্পকলা যুক্ত হয়ে তা যখন STEAM-এ রূপ নেয়, তখন শিক্ষার্থীদের মাঝে সৃজনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটে। বিজ্ঞানী মিজানুল এইচ চৌধুরী ও প্রফেসর জাহাঙ্গীর আলমের মতে, ২০৩০ সালের মধ্যে প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাবে বাংলাদেশে প্রায় ৫.৭ মিলিয়ন শ্রমিকের চাকরি হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় সৃজনশীল সমাধান ও অভিযোজন ক্ষমতা গড়ে তোলাই STEAM শিক্ষার মূল লক্ষ্য।
স্ক্যান্ডিনেভীয় মডেল ও বাংলাদেশের সম্ভাবনা
ফিনল্যান্ড, সুইডেন বা ডেনমার্কের মতো দেশগুলোতে দ্বিতীয় শ্রেণি থেকেই রোবটিক্স ও চতুর্থ শ্রেণি থেকে প্রতিযোগিতামূলক প্রোগ্রামিং শুরু হয়। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এমন একটি ‘কনভার্জেন্ট’ শিক্ষাপদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে যেখানে চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাথে কম্পিউটিং কিংবা ক্রীড়া বিজ্ঞানের সাথে মেশিন লার্নিংয়ের মেলবন্ধন ঘটবে।
আগামীর দক্ষ জনশক্তি ও নেতৃত্ব
স্মার্ট ফিউচার বাংলাদেশ গড়তে হলে ন্যানোটেকনোলজি, সাইবার সিকিউরিটি এবং মাইক্রোচিপ ডিজাইনের মতো প্রযুক্তিতে আমাদের পারদর্শী হতে হবে। মিজানুল এইচ চৌধুরী ও ড. জাহাঙ্গীর আলম মনে করেন, শিক্ষার্থীদের এমনভাবে শিক্ষিত করতে হবে যাতে তারা কেবল প্রযুক্তির ব্যবহারকারী নয়, বরং উদ্ভাবক হিসেবে গড়ে ওঠে। নাসা ও জাক্সা-র (JAXA) মতো আন্তর্জাতিক মহাকাশ সংস্থার সাথে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা ইতিমধ্যে প্রমাণ করেছে যে, সঠিক সুযোগ পেলে আমাদের তরুণরা বিশ্বজয়ে সক্ষম।
উপসংহারে বলা যায়, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ওপর, যেখানে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিটি নাগরিকের হাতের মুঠোয় পৌঁছাবে। এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় আমরা পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকব।

আপনার মূল্যবান মতামত জানান এবং আমাদের নিয়মিত আপডেট পেতে businesstoday24.com ফলো করুন ও মন্তব্য করুন।