Home First Lead সয়াবিন তেলের বাজারে অস্থিরতা: বিপাকে সাধারণ ভোক্তা

সয়াবিন তেলের বাজারে অস্থিরতা: বিপাকে সাধারণ ভোক্তা

কামরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম: দেশের ভোজ্যতেলের বাজারে আবারও অস্থিরতার ছায়া নেমে এসেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে দেশীয় মিলমালিকরা লিটারপ্রতি ১২ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু বাজার বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের আগেই কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সাধারণ ভোক্তার পকেট থেকে বাড়তি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী।
আন্তর্জাতিক বাজারের বর্তমান চিত্র
শিকাগো বোর্ড অব ট্রেড (CBOT) এবং বিশ্ববাজারের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের গড় মূল্য প্রতি মেট্রিক টন ১,২৪০ থেকে ১,২৭০ মার্কিন ডলারের মধ্যে ওঠানামা করছে। গত বছরের ডিসেম্বরের তুলনায় এই দর বেড়েছে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ ডলার। আমদানিকারকদের দাবি, বর্ধিত ডলার রেট এবং শিপিং চার্জ মিলিয়ে বর্তমান বাজারে তেলের আমদানি ব্যয় লিটারপ্রতি ২১৫ থেকে ২২০ টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
দেশের বাজারে প্রস্তাবিত ও বর্তমান দরের ফারাক
বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন ১ লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১৯৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০৭ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে। ৫ লিটারের বোতল বর্তমানে ৯৫৫ টাকা হলেও তা বাড়িয়ে ১,০২০ টাকা করার দাবি জানানো হয়েছে। যদিও মিলমালিকদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় তাদের প্রস্তাবিত এই দামও কম, তবুও সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এটি বড় ধরনের বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।
কৃত্রিম সংকট ও মজুতদারির কারসাজি
সরকার এখনও নতুন দাম অনুমোদন না করলেও মাঠপর্যায়ে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। অভিযোগ উঠেছে, নতুন দামের আশায় পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা গুদামে তেল মজুত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছেন। অনেক এলাকায় খুচরা পর্যায়ে ১৯৫ টাকার বোতলজাত তেল ২০০ থেকে ২০৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খোলা সয়াবিন তেলের ক্ষেত্রে এই অরাজকতা আরও বেশি; ১৭৬ টাকার খোলা তেল অনেক জায়গায় ১৯৫ থেকে ২১০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।
ভোক্তার নাভিশ্বাস
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে দেশে সাথে সাথে বাড়ানো হয়, কিন্তু বিশ্ববাজারে দাম কমলে তার সুফল ভোক্তাদের কাছে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ করা হয়। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর মতে, আমদানিকারকদের কাছে পর্যাপ্ত পুরোনো মজুত থাকা সত্ত্বেও দাম বাড়ানোর ঘোষণা আসার আগেই সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া এক ধরনের অনৈতিক বাণিজ্য।
আগামী রোববার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ব্যবসায়ীদের সাথে বৈঠকের কথা রয়েছে। সেখান থেকেই নির্ধারিত হবে তেলের নতুন দাম। সাধারণ ভোক্তাদের প্রত্যাশা, সরকার যেন কেবল ব্যবসায়ীদের প্রস্তাব নয়, বরং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এবং মজুতদারদের সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে একটি যৌক্তিক সমাধান নিশ্চিত করে।
 ভোজ্যতেলের বার্ষিক চাহিদা
বাংলাদেশে বর্তমানে ভোজ্যতেলের মোট বার্ষিক চাহিদা প্রায় ২৪ থেকে ২৫ লাখ মেট্রিক টন। ২০২৬ সালের শুরুর দিকের তথ্য অনুযায়ী, এই চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। মাত্র ১০ শতাংশ চাহিদা দেশীয়ভাবে উৎপাদিত সরিষা, তিল এবং সূর্যমুখী তেল দিয়ে মেটানো সম্ভব হয়।
সয়াবিন তেলের অংশ
ভোজ্যতেলের মোট বাজারের মধ্যে সয়াবিন তেলের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিসংখ্যানে দেখা যায়:
দেশে ব্যবহৃত মোট ভোজ্যতেলের প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ সয়াবিন তেল।
অবশিষ্ট চাহিদার বড় একটি অংশ (প্রায় ৫০-৫৫ শতাংশ) পূরণ হয় পাম অয়েল দিয়ে, যা মূলত হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে বেশি ব্যবহৃত হয়।
বাসা-বাড়িতে রান্নার কাজে প্রায় ৯৯ শতাংশ মানুষ সয়াবিন তেলের ওপর নির্ভরশীল।
৩. আমদানির উৎস (যেসব দেশ থেকে আসে)
বাংলাদেশ মূলত অপরিশোধিত (Crude) সয়াবিন তেল এবং সয়াবিন বীজ (Seed) আমদানি করে। প্রধান আমদানিকারক দেশগুলো হলো:
  • আর্জেন্টিনা: বাংলাদেশের সয়াবিন তেলের সিংহভাগই আসে আর্জেন্টিনা থেকে। এটি একক দেশ হিসেবে প্রধান উৎস।
  • ব্রাজিল: দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস হিসেবে ব্রাজিল থেকে বিপুল পরিমাণ সয়াবিন তেল ও বীজ আমদানি করা হয়।
  • প্যারাগুয়ে ও উরুগুয়ে: দক্ষিণ আমেরিকার এই দুটি দেশ থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আসে।
  • অন্যান্য: এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারত থেকেও মাঝেমধ্যে নির্দিষ্ট পরিমাণ সয়াবিন তেল আমদানি করা হয়।
অন্যদিকে, পাম অয়েলের জন্য বাংলাদেশ মূলত ইন্দোনেশিয়া এবং মালয়েশিয়ার ওপর নির্ভরশীল।