Home Second Lead হাসির আড়ালে দন্ত-বাণিজ্য: ডেন্টিস্ট ও ডেন্টাল ক্লিনিকের জালিয়াতি

হাসির আড়ালে দন্ত-বাণিজ্য: ডেন্টিস্ট ও ডেন্টাল ক্লিনিকের জালিয়াতি

আপনি কি সঠিক চিকিৎসা পাচ্ছেন নাকি দাঁত হারাচ্ছেন?

সিরিজ প্রতিবেদন

পকেটে সিঁধ: ভোক্তার প্রতিদিনের লড়াই 

কামরুল হাসান
দাঁতের ব্যথা সহ্য করা কঠিন, আর এই যন্ত্রণার সুযোগ নেয় এক শ্রেণির অসাধু ডেন্টাল ক্লিনিক। দাঁত তোলা, ফিলিং বা রুট ক্যানেলের মতো সাধারণ চিকিৎসায় “ভুয়া ডিগ্রিধারী” ডাক্তারদের দাপট এখন অলিগলিতে। দামী ইমপ্ল্যান্ট বা ক্যাপের নামে সস্তা মেটাল গছিয়ে দেওয়া কিংবা সাধারণ ক্যাভিটিকে বড় অপারেশন বলে ভয় দেখানো এখন নিয়মিত ঘটনা। এই ‘দাঁত-জালিয়াতি’ কেবল আপনার পকেট খালি করছে না, বরং ভুল চিকিৎসায় আপনার মুখগহ্বরে ক্যানসার বা হেপাটাইটিসের মতো ভয়ংকর রোগ ডেকে আনছে।
বিজনেসটুডে২৪-এর অনুসন্ধানে ডেন্টাল চিকিৎসার পেছনের কিছু চতুর জালিয়াতি বেরিয়ে এসেছে।
ডেন্টাল ক্লিনিকে যেভাবে চলে ‘দাঁতভাঙা’ জালিয়াতি
১. টেকনিশিয়ান যখন ‘ডাক্তার’: অনেক ডেন্টাল ক্লিনিকে মূল বিডিএস (BDS) ডাক্তার থাকেন না। ল্যাব টেকনিশিয়ান বা সহকারীরাই নিজেদের ‘ডাক্তার’ পরিচয় দিয়ে চিকিৎসা দেন। তারা দাঁতের গভীরে না বুঝে ড্রিল করেন, ফলে নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে স্থায়ী প্যারালাইসিস বা তীব্র সংক্রমণ হতে পারে। ভুয়া ডিগ্রি বা বিএমডিসি (BMDC) রেজিস্ট্রেশন নম্বর ছাড়াই তারা চেম্বার খুলে বসেছেন।
২. রুট ক্যানেল ও ফিলিংয়ে কারসাজি: দাঁতের সামান্য গর্ত বা ক্যাভিটি হলেও অনেক সময় বলা হয় “রুট ক্যানেল ছাড়া উপায় নেই”, যাতে বেশি টাকা বিল করা যায়। ফিলিংয়ের ক্ষেত্রে দামী ‘কম্পোজিট’ বা ‘সিরামিক’ এর কথা বলে সস্তা মানের পুডিং বা সাধারণ সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়, যা কয়েক মাস পরেই ঝরে পড়ে।
৩. ক্যাপ ও ইমপ্ল্যান্টের ‘ব্র্যান্ড’ ধোঁকা: দাঁতের ক্যাপ লাগানোর সময় ‘জার্মান’ বা ‘আমেরিকান’ সিরামিক বলে কয়েক হাজার টাকা নেওয়া হয়, কিন্তু ল্যাব থেকে সস্তা ‘মেটাল-পোরসেলিন’ ক্যাপ আনিয়ে লাগানো হয়। ইমপ্ল্যান্টের (দাঁত বসানো) ক্ষেত্রেও নিম্নমানের স্ক্রু বা ধাতু ব্যবহার করা হয় যা মাড়িতে ইনফেকশন তৈরি করতে পারে।
৪. জীবাণুমুক্তকরণের অবহেলা (Sterilization): ডেন্টাল চিকিৎসায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি যদি ঠিকমতো ‘অটোক্লেভ’ বা জীবাণুমুক্ত করা না হয়, তবে একজন রোগীর লালা বা রক্ত থেকে অন্য রোগীর শরীরে এইডস (HIV) বা হেপাটাইটিস-বি ছড়িয়ে পড়তে পারে। অনেক সস্তা ক্লিনিকে কেবল গরম পানিতে ধুয়ে একই যন্ত্র সবার মুখে ব্যবহার করা হয়।
ডেন্টিস্ট দেখানোর সময় প্রতারণা এড়াতে যা করবেন:
বিএমডিসি (BMDC) নম্বর যাচাই: ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন বা নেমপ্লেটে বিএমডিসি রেজিস্ট্রেশন নম্বর আছে কি না দেখুন। অনলাইনে বিএমডিসি সাইটে গিয়ে এই নম্বর দিয়ে যাচাই করুন তিনি আসলেও ডাক্তার কি না।
যন্ত্রপাতির পরিচ্ছন্নতা: আপনার সামনে নতুন গ্লাভস পরছে কি না এবং যন্ত্রপাতিগুলো প্যাকেট থেকে বের করা হচ্ছে কি না খেয়াল করুন। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চিকিৎসা নেবেন না।
ব্যবহৃত সামগ্রীর প্যাকেট: যদি দাঁতে ইমপ্ল্যান্ট বা কোনো বিশেষ দামী মেটেরিয়াল ব্যবহার করা হয়, তবে তার মূল প্যাকেট বা গ্যারান্টি কার্ডটি চেয়ে নিন।
রেডিয়েশন সতর্কতা: এক্স-রে করার সময় লিড অ্যাপ্রন (Lead Apron) ব্যবহার করা হচ্ছে কি না দেখুন। অপ্রয়োজনীয় এক্স-রে এড়িয়ে চলুন।
সতর্কতা ও অধিকার:
দাঁত একবার নষ্ট হলে তা ফিরে পাওয়া অসম্ভব। সস্তায় বিজ্ঞাপনী অফার দেখে হুট করে কোনো ক্লিনিকে ঢুকে পড়বেন না। ভুল চিকিৎসার শিকার হলে বা প্রতারিত হলে বিএমডিসি অথবা ভোক্তা অধিকারের হটলাইন ১৬১২১ নম্বরে অভিযোগ করুন।