বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, মিরসরাই ( চট্টগ্রাম): হাজারো মানুষ পানিতে ডুবে প্রাণ হারাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও বাংলাদেশ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে গড়ে প্রতিবছর প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়। এর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি শিশু ও কিশোর। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মৃত্যুর হারকে নীরব মহামারী বলা যায়। কারণ দুর্ঘটনা হলেও এটি প্রতিদিনই ঘটে চলেছে এবং পরিবারগুলোকে গভীর শোকে নিমজ্জিত করছে।
পানিতে ডুবে মৃত্যুর সাম্প্রতিক উদাহরণ দেখা গেছে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে। সোমবার দুপুরে দুই ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি পরিবার তাদের সন্তান হারিয়েছে। মিরসরাইয়ের হিঙ্গুলী ইউনিয়নের মেহেদীনগরে ৮ বছরের আশিকুল ইসলাম এবং সাহেরখালী ইউনিয়নের সাহেরখালী গ্রামে দেড় বছরের শিশু রাইফ চৌধুরী পানিতে পড়ে মারা যায়।
আশিকুল ইসলাম স্থানীয় একটি নূরানী মাদ্রাসার দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। দুপুরে খেলার ছলে সে প্রতিবেশী দুই শিশুর সঙ্গে বাইরে যায়। অসাবধানতাবশত কাছের একটি পুকুরে পড়ে গেলে তার খেলার সাথীরা ঘটনাটি পরিবারের লোকজনকে জানায়। দ্রুত উদ্ধার করে স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহত শিশুর মামা সিরাজ উদ্দিন বলেন, কয়েক মিনিটের অসতর্কতা আমাদের পরিবারকে শোকে ভাসিয়েছে।
অন্যদিকে সাহেরখালী গ্রামের শিশু রাইফ চৌধুরী খেলতে খেলতে ঘরের পাশের পুকুরে পড়ে যায়। পরিবারের লোকজন দ্রুত উদ্ধার করে মিরসরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার নানা সরওয়ার চৌধুরী বলেন, এমন মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না, কিন্তু গ্রামে প্রতিদিনই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে।
বাংলাদেশে শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছরের নিচে শিশু মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ হলো পানিতে ডুবে যাওয়া। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে এই হার বাড়ে। তবে শুষ্ক মৌসুমেও গ্রামীণ এলাকায় পুকুর, খাল, নদী বা ডোবার কারণে প্রায় প্রতিদিনই শিশু ডুবে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রামের শিশুদের খেলার ক্ষেত্র না থাকায় তারা সহজেই পুকুরপাড় বা জলাশয়ের আশপাশে চলে যায়, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০ জন মানুষ বাংলাদেশে পানিতে ডুবে মারা যায়। এর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি শিশু। কিন্তু এসব মৃত্যুকে এড়ানো সম্ভব যদি পরিবার ও সমাজ সচেতন হয়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের সবসময় পানির কাছে অভিভাবকের তত্ত্বাবধানে রাখা, জলাশয়ের চারপাশে বেড়া দেওয়া, শিশুদের সাঁতার শেখানো এবং প্রাথমিক চিকিৎসা বা লাইফসেভিং স্কিল শেখানো গেলে উল্লেখযোগ্যভাবে মৃত্যুহার কমানো সম্ভব।
সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলো ইতিমধ্যে শিশুদের সাঁতার শেখানো এবং গ্রামে কমিউনিটি-ভিত্তিক নিরাপদ খেলার মাঠ তৈরি নিয়ে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। তবে তা এখনও যথেষ্ট নয়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্কুল পর্যায়ে পানিতে নিরাপত্তা শিক্ষাকে অন্তর্ভুক্ত করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে জনসচেতনতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে আশিকুল ও রাইফের মৃত্যু শুধু দুটি পরিবারকেই শোকে ভাসায়নি, এটি পুরো সমাজকে আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে যে পানিতে ডুবে যাওয়া বাংলাদেশে এখনো একটি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি। সময়মতো কার্যকর উদ্যোগ না নিলে এ ধরনের মর্মান্তিক মৃত্যুহার কমানো সম্ভব হবে না।










