বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: দেশে পানির পর্যাপ্ত উৎস থাকলেও নিরাপদ পানির তীব্র সংকটে ভুগছে বিশাল একটি জনগোষ্ঠী। পানি উত্তোলন ও ব্যবস্থাপনায় ত্রুটির কারণে উৎসের পানি থেকে শুরু করে বাসাবাড়িতে সংরক্ষিত খাবার পানি পর্যন্ত, সবই এখন দূষণের কবলে। সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের যৌথভাবে পরিচালিত ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস)’-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র। জরিপে দেখা গেছে, দেশের ৪৭ দশমিক ১ শতাংশ পানির উৎসে এবং বাসাবাড়িতে সংরক্ষিত ৮৫ শতাংশ পানিতে ক্ষতিকর ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া রয়েছে।
জরিপের সারসংক্ষেপ
দুই-পর্যায়ের স্তরীভূত ক্লাস্টার স্যাম্পলিং পদ্ধতিতে পরিচালিত এই জরিপে ৩ হাজার ১৪৯টি প্রাথমিক স্যাম্পলিং ইউনিট থেকে ৬২ হাজার ৯৮০টি খানা বা পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। প্রতিবেদনে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) সঙ্গে সম্পর্কিত ২৭টি সূচকসহ মোট ১৭২টি সূচক যাচাই করা হয়।
উৎস থেকে ঘর: দূষণের ভয়াবহ চিত্র
জরিপের তথ্যমতে, নলকূপ, পাইপড ওয়াটার, বা বোরহোলের মতো পানির উৎসগুলোতে ৪৭ শতাংশ ক্ষেত্রে ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। তবে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, পানি সংগ্রহের পর ঘরে আনার পথে বা সংরক্ষণের সময় তা আরও বেশি দূষিত হচ্ছে। ঘরে সংরক্ষিত পানির ৮৫ শতাংশেই অতিমাত্রায় ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পানি সংরক্ষণের পাত্র অপরিষ্কার থাকা, খোলা মুখের কলস বা বালতি ব্যবহার, অপরিচ্ছন্ন মগ বা গ্লাস ব্যবহার এবং শিশুদের হাত পানির পাত্রে লাগার কারণে ঘরে পানি সহজেই দূষিত হচ্ছে। এছাড়া রান্নাঘর ও বাথরুমের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশও এর জন্য দায়ী।
গ্রাম ও শহরের চিত্র
প্রতিবেদনে দেখা যায়, শহর ও গ্রাম উভয় অঞ্চলেই পানি দূষণের হার অত্যন্ত বেশি। তবে শহরের তুলনায় গ্রামে বাসাবাড়িতে পানি দূষণের হার বেশি।
গ্রাম: ৮৭.৫ শতাংশ বাড়িতে পানি দূষিত।
শহর: ৭৮.৫ শতাংশ বাড়িতে পানি দূষিত।
অর্থনৈতিক অবস্থার ভিত্তিতেও দূষণের তারতম্য লক্ষ্য করা গেছে। দরিদ্র পরিবারগুলোর পানীয় জলের ৯০ দশমিক ৪ শতাংশই ই-কোলাই দ্বারা দূষিত, যেখানে ধনী পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে এই হার ৭৪ দশমিক ৩ শতাংশ।
স্বাস্থ্যঝুঁকি ও কারণ
পানিতে ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, এটি মলমূত্র বা পয়োবর্জ্যের সংস্পর্শে এসেছে। অগভীর নলকূপ, স্যুয়ারেজ লাইনের লিকেজ এবং উৎসের আশপাশের নোংরা পরিবেশ এর মূল কারণ। মৌলিক স্যানিটেশন সুবিধার অভাব এবং মলমূত্রের অনিরাপদ নিষ্কাশন পানি দূষণকে ত্বরান্বিত করছে। এর ফলে ডায়রিয়া, কলেরা এবং পেটের পীড়াসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা। অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, “নিরাপদ পানির প্রাপ্যতায় আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে। ‘সবার জন্য পানি’ আর ‘সবার জন্য নিরাপদ পানি’ এক বিষয় নয়। এসডিজির অর্জন নিয়ে আমরা আত্মতুষ্টিতে ভুগছি, কিন্তু নিরাপদ পানি নিশ্চিত করার সক্ষমতায় ঘাটতি রয়ে গেছে।”
ওয়াটার এইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর হাসিন জাহান বলেন, “উৎস থেকে উত্তোলন এবং ব্যবস্থাপনায় সংকট দূর করা না গেলে ই-কোলাইয়ের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব নয়।”
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের ৯৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষের মৌলিক পানির সুবিধা থাকলেও ই-কোলাই ও আর্সেনিকমুক্ত সম্পূর্ণ নিরাপদ পানি পান করতে পারছে মাত্র ৩৯ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় কেবল পানির উৎস নিশ্চিত করলেই হবে না, বরং এর গুণমান ও সুরক্ষায় জোর দেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে।










