‘বাঁচবে প্রবাল, বাঁচবে দ্বীপ: সেন্ট মার্টিনের আগামীর রূপরেখা’
পর্ব-৫
কামরুল ইসলাম, ঢাকা: সেন্ট মার্টিন দ্বীপে পা রাখলেই এখন যে জিনিসটি সবার আগে চোখে পড়ে, তা নীল জলরাশি নয়, তা হলো সৈকতজুড়ে পড়ে থাকা প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেট আর ডাবের খোসা। দ্বীপের বাতাস ভারি হয়ে আছে অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা আর জেনারেটরের ধোঁয়ায়। এই দূষণ সরাসরি হত্যা করছে দ্বীপের প্রাণভোমরা, প্রবাল ও সামুদ্রিক কচ্ছপকে।
তবে ‘মাস্টার প্ল্যান: সেন্ট মার্টিন দ্বীপ (সেপ্টেম্বর ২০২৫)’ এই চিত্রটি সম্পূর্ণ বদলে ফেলার স্বপ্ন দেখাচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের এই মহাপরিকল্পনায় দ্বীপটিকে ‘প্লাস্টিকমুক্ত’ ঘোষণা করার পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো উন্নয়নে নেওয়া হয়েছে আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত সব পদক্ষেপ।
দ্বীপ কোনো ভাগাড় নয়: বর্জ্য যাবে মূল ভূখণ্ডে
মাস্টার প্ল্যানের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অংশের মূল দর্শন হলো—সেন্ট মার্টিন দ্বীপ কোনো ডাম্পিং স্টেশন বা ভাগাড় নয়। ছোট এই দ্বীপের মাটিতে বর্জ্য পচানোর বা পুঁতে রাখার মতো জায়গা নেই।
পরিকল্পনা অনুযায়ী:
১. থ্রি-আর নীতি: দ্বীপে ‘Reduce, Reuse, Recycle’ নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে।
২. বর্জ্য পৃথকীকরণ: হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলোকে উৎসস্থলেই পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য আলাদা করতে হবে।
৩. মূল ভূখণ্ডে স্থানান্তর: দ্বীপে জমা হওয়া প্লাস্টিক, ক্যান এবং অন্যান্য অপচনশীল বর্জ্য বিশেষ ব্যবস্থায় জাহাজে করে মূল ভূখণ্ডে (টেকনাফ বা কক্সবাজার) পাঠিয়ে দেওয়া হবে। সেখানে রিসাইক্লিং প্ল্যান্টে সেগুলোর ব্যবস্থা করা হবে।
৪. সিউয়েজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট : বর্তমানে হোটেলগুলোর পয়ঃবর্জ্য সরাসরি সমুদ্রে বা মাটিতে মিশছে, যা প্রবালের জন্য বিষতুল্য। মাস্টার প্ল্যানে কেন্দ্রীয়ভাবে এবং বড় রিসোর্টগুলোর জন্য নিজস্ব ‘সিউয়েজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট’ বসানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পরিশোধিত না করে এক ফোঁটা পানিও সমুদ্রে ফেলা যাবে না।
রাস্তায় ‘কুল পেভমেন্ট’ প্রযুক্তি
দ্বীপের তাপমাত্রা বাড়ছে, যা স্থানীয় প্রতিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ। মাস্টার প্ল্যানের অবকাঠামো উন্নয়ন অংশে (ID-01) দ্বীপের রাস্তাঘাটের জন্য ‘কুল পেভমেন্ট’ প্রযুক্তির প্রস্তাব করা হয়েছে।
সাধারণ পিচঢালা বা কংক্রিটের রাস্তা প্রচুর তাপ শোষণ করে পরিবেশ গরম করে তোলে। কিন্তু ‘কুল পেভমেন্ট’ হলো বিশেষ ধরণের উপাদান ও রঙের প্রলেপযুক্ত রাস্তা, যা সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে এবং তাপ শোষণ করে না।
এর সুবিধা দুটি:
দ্বীপের গড় তাপমাত্রা কম থাকবে, যা পর্যটক ও স্থানীয়দের জন্য আরামদায়ক।
এই রাস্তাগুলো হবে ‘পারমিয়েবল’ বা ছিদ্রযুক্ত। অর্থাৎ বৃষ্টির পানি রাস্তার ওপর দিয়ে গড়িয়ে সাগরে চলে না গিয়ে মাটির নিচে চুঁইয়ে পড়বে। এতে দ্বীপের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আবার পূর্ণ হবে।
সবুজ দালান ও ভার্টিক্যাল গ্রিনিং
দ্বীপের হোটেল ও স্থাপনাগুলো এখন কংক্রিটের জঙ্গল। মাস্টার প্ল্যানে দালানকোঠায় ‘ভার্টিক্যাল গ্রিনিং সিস্টেম’ বা উল্লম্ব সবুজায়ন চালুর কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ ভবনের দেয়াল ও ছাদে বিশেষ লতাপাতা ও গাছ লাগাতে হবে। এটি ভবনের ভেতরের তাপমাত্রা কমাবে এবং দ্বীপের সবুজের আচ্ছাদন বাড়াতে সাহায্য করবে।
আলো ও শব্দ দূষণ রোধ
সেন্ট মার্টিন কেবল মানুষের নয়, এটি সামুদ্রিক কচ্ছপের ডিম পাড়ার জায়গা। উজ্জ্বল আলো এবং জেনারেটরের শব্দে কচ্ছপরা ডিম পাড়তে আসতে ভয় পায়।
নতুন পরিকল্পনায়:
- রাতে সৈকত সংলগ্ন এলাকায় উচ্চমাত্রার আলো জ্বালানো নিষিদ্ধ থাকবে।
- শব্দ দূষণ রোধে জেনারেটরের বদলে সোলার গ্রিড বা নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হবে।
- শব্দহীন ও পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক যান (ই-রিকশা) ছাড়া অন্য কোনো যান্ত্রিক বাহন দ্বীপে চলতে পারবে না।
বাস্তবতার চ্যালেঞ্জ
কাগজে-কলমে এই পরিকল্পনাগুলো বৈপ্লবিক মনে হলেও, এর বাস্তবায়ন বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটকের ফেলা বর্জ্য মূল ভূখণ্ডে পরিবহন করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জটিল প্রক্রিয়া। এছাড়া স্থানীয় হোটেল মালিকরা ব্যয়বহুল STP বসাতে কতটা আগ্রহী হবেন, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।
তবে পরিবেশবিদরা বলছেন, সেন্ট মার্টিনকে বাঁচাতে হলে এই ‘কঠিন’ পথেই হাঁটতে হবে। একটু ছাড় দিলেই দ্বীপটি চিরতরে হারিয়ে যাবে।










