Home সারাদেশ জ্বীনের বাদশা পিতলের মূর্তিসহ গ্রেপ্তার

জ্বীনের বাদশা পিতলের মূর্তিসহ গ্রেপ্তার

কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলায় জ্বীনের বাদশা পরিচয়ে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে এনামুল হক (৪২) নামে এক ব্যক্তিকে পিতলের মূর্তিসহ গ্রেপ্তারের ঘটনাটি কেবল একটি ফৌজদারি অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি গ্রামীণ সমাজের একটি গভীর সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।

 নয়ন দাস, কুড়িগ্রাম: ফুলবাড়ী উপজেলার বোয়াইলভীর এলাকার মৃত আবদার আলীর ছেলে এনামুল হক দীর্ঘ দিন ধরে নিজেকে ‘জ্বীনের বাদশা’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে সাধারণ মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করছিলেন। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, তার প্রতারণার বিষয়টি পরিষ্কার হওয়ার পর রোববার সন্ধ্যায় এলাকার মানুষ তাকে আটক করে পুলিশকে খবর দেয়। ফুলবাড়ী থানা পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে তাকে হেফাজতে নেয় এবং একটি পিতলের মূর্তি উদ্ধার করে।

সোমবার সকালে এনামুল হকের বিরুদ্ধে ৪০৬/৪২০ পেনাল কোডে মামলা দায়ের করা হয়, যা যথাক্রমে বিশ্বাসভঙ্গ এবং প্রতারণা জনিত অপরাধের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফুলবাড়ী থানার ওসি শওকত আলী সরকারের তথ্য অনুযায়ী, তাকে আদালতে সোপর্দ করা হলে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন হওয়ার মাধ্যমে প্রশাসন প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তাদের কঠোর অবস্থান স্পষ্ট করেছে।

প্রতারণার মূলে সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ

এই ঘটনাটি একটি বৃহত্তর সামাজিক সমস্যা নির্দেশ করে, যেখানে তথাকথিত ‘জ্বীনের বাদশা’ বা ‘তান্ত্রিক’ ধরনের প্রতারকেরা সুযোগ পায়:

শিক্ষার অভাব ও কুসংস্কার: বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে, বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে, এখনও শিক্ষার আলো পুরোপুরি পৌঁছায়নি। এর ফলে, জ্বীন, ভূত, অলৌকিক ক্ষমতা বা ভাগ্য পরিবর্তনের সহজ পথ খোঁজার মতো কুসংস্কার প্রবলভাবে বিদ্যমান। এই ধরনের মানসিক দুর্বলতা প্রতারকদের জন্য একটি উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করে।

অর্থনৈতিক হতাশা ও আকাঙ্ক্ষা: দ্রুত ধনী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা, অসুস্থতা থেকে মুক্তি, বা যেকোনো সমস্যার অলৌকিক সমাধান খোঁজা মানুষ সহজেই এমন মিথ্যা প্রলোভনে পা দেয়। ‘জ্বীনের বাদশা’ নামধারী প্রতারকরা সাধারণত ফোন কল বা চিঠির মাধ্যমে ‘গুপ্তধন’ বা ‘অমূল্য সম্পদ’ পাইয়ে দেওয়ার লোভ দেখিয়ে অর্থ আদায় করে।

আস্থার অভাব এবং সরলতা: প্রান্তিক জনগোষ্ঠী অনেক সময় আইন, প্রশাসন বা বিজ্ঞানভিত্তিক সমাধানের ওপর আস্থা রাখার বদলে তথাকথিত আধ্যাত্মিক সমাধানের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এনামুল হকের মতো ব্যক্তিরা এই সরল বিশ্বাসকেই পুঁজি করে নিজেদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যায়।

এনামুল হককে গ্রেপ্তারের ঘটনায় আইন তার পথে হেঁটেছে। কিন্তু সমাজকে রক্ষা করতে হলে শুধু অপরাধীকে গ্রেপ্তার করাই যথেষ্ট নয়। এই ঘটনাটি নীতিনির্ধারক, স্থানীয় সরকার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির জন্য একটি সতর্কবার্তা:

জনসচেতনতা বৃদ্ধি: কুসংস্কার এবং অলৌকিক উপায়ে ধনী হওয়ার মিথ্যা ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে জনগণকে সচেতন করতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন, ধর্মীয় নেতা এবং শিক্ষাবিদদের যৌথ উদ্যোগে সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালানো আবশ্যক।

আইনের কঠোর প্রয়োগ: ছোট আকারের হলেও এই ধরনের প্রতারণার ঘটনাগুলি সমাজে বড় ধরনের আস্থার সংকট তৈরি করে। তাই আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা দরকার।

ফুলবাড়ীর এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করল যে, ‘জ্বীনের বাদশা’ কেবল একটি চরিত্র নয়, এটি সমাজ থেকে দূর করার মতো একটি গভীর কুসংস্কার, যা দূরীকরণে শুধু পুলিশি তৎপরতা নয়, সামাজিক দৃঢ়তা ও বিজ্ঞানমনস্কতার প্রসারও জরুরি।