কৃষ্ণা বসু, কলকাতা: রিল লাইফকে হার মানাল রিয়েল লাইফ! সিনেমার চিত্রনাট্যও বোধহয় এই ঘটনার কাছে ফিকে পড়ে যাবে। ঠিক যেন ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’-এর পার্ট-৩! নায়ক স্টিল কারখানার সামান্য কর্মী, আর নায়িকা শহরের নামী ব্যবসায়ী পরিবারের আদরের দুলালী। বিত্ত আর চিত্তের এই লড়াইয়ে সোমবার দুপুরে রণক্ষেত্র হয়ে উঠল বালুরঘাট থানা চত্বর। প্রেমিকের শরীর বেয়ে ঝরল রক্ত, আর প্রেমিকা? মায়ের জেদ মেটাতে থানা চত্বরেই গা থেকে খুলে ছুড়ে ফেলে দিলেন সমস্ত সোনার গয়না!
ঘটনাটি সোমবার দুপুরের। বালুরঘাট থানা চত্বরে তখন চাঁদিফাটা রোদ। আচমকাই শুরু হলো হুলুস্থুল। একদিকে বরপক্ষ, অন্যদিকে কনেপক্ষের প্রায় ৪০ জন! মাঝখানে দাঁড়িয়ে সদ্য বিবাহিত এক যুগল। চলছে রীতিমতো দড়ি টানাটানি। মেয়ের বাড়ির লোক টানছে মেয়েকে, আর নতুন বর প্রাণপণে আঁকড়ে ধরে আছে স্ত্রীর হাত। এই অসম লড়াইয়ে নতুন জামাইয়ের হাতে আঘাত লাগে, ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটতে থাকে। কিন্তু রক্ত ঝরলেও, হাত ছাড়েননি প্রেমিক। আর প্রেমিকাও সাফ জানিয়ে দিলেন, “রক্ত দিলেও বাবার বাড়িতে ফিরব না, স্বামীর ঘরই আমার স্বর্গ।”
বালুরঘাটের খিদিরপুর এলাকার বিত্তবান পরিবারের মেয়ে তিনি, বালুরঘাট কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। অন্যদিকে প্রেমিক চকচন্দন গ্রামের সাধারণ এক যুবক, পেশায় স্টিল কারখানার কর্মী। টাকার পাহাড় আর টিনের চাল— এই দুইয়ের মিলন মেনে নিতে পারেনি তরুণীর পরিবার। মেয়ের বিয়ে ঠিক করা হয়েছিল অন্যত্র। কিন্তু ভালোবাসা তো বাঁধন মানে না! তাই প্রেমিকের হাত ধরে সটান তারাপীঠ। সেখানেই সাতপাকে বাঁধা পড়েন তাঁরা। আইনি স্বীকৃতির জন্য সোমবার তাঁরা হাজির হয়েছিলেন বালুরঘাট থানায়।
থানায় ক্লাইম্যাক্স সিন:
মেয়ের বাড়ির লোক খবর পেতেই অগ্নিশর্মা হয়ে ছুটে আসেন থানায়। শুরু হয় মারধর, গালাগালি আর হুমকি। আহত স্বামীর পাশে দাঁড়িয়ে বাঘিনীর মতো গর্জে ওঠেন তরুণী। বলেন, “বাবার অগাধ সম্পত্তি থাকতে পারে, কিন্তু আমি যাকে ভালোবাসি, সে গরিব হলেও আমি তার কাছেই থাকব।”
সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্ত:
পরিস্থিতি হাতের বাইরে যাচ্ছে দেখে আসরে নামেন তরুণীর মা। রাগে ফেটে পড়ে তিনি চিৎকার করে বলেন, “আমার মেয়েকে আর চাই না! কিন্তু গায়ে যা গয়না আছে, পরনের শাড়ি— সব আমাদের দেওয়া। ওসব খুলে দিয়ে যা।”
মুহূর্তের স্তব্ধতা। তারপরই ঘটল সেই অভাবনীয় ঘটনা। শত শত লোকের সামনে, পুলিশি পাহারায়, চোখের জল মুছে এক এক করে গায়ের সমস্ত গয়না খুলে মায়ের হাতে তুলে দিলেন ওই তরুণী। জানিয়ে দিলেন, বিলাসিতা নয়, ভালোবাসাই তাঁর পছন্দ। এমনকি পরনের পোশাকও ফেরত পাঠিয়ে দেবেন বলে জানিয়ে স্বামীর হাত ধরে থানার গেট দিয়ে বেরিয়ে গেলেন তিনি।
পিছনে পড়ে রইল একরাশ অভিমান, আর বিত্তের অহংকার ধুলোয় মিশে যাওয়ার গল্প। বালুরঘাটের এই ‘রাহুল-প্রিয়াঙ্কা’র কাহিনি এখন লোকের মুখে মুখে। ভালোবাসা যে আজও সব বাধা টপকে জিততে পারে, রক্ত দিয়ে তা প্রমাণ করলেন এই দম্পতি।










