Home স্বাস্থ্য নীরব ঘাতক স্তন ক্যান্সার: লজ্জা আর অজ্ঞতায় বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি

নীরব ঘাতক স্তন ক্যান্সার: লজ্জা আর অজ্ঞতায় বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি

সংগৃহীত ছবি

হেলথ ডেস্ক:

শরীরে যে মরণব্যাধি বাসা বেঁধেছে, তা ৬ মাস আগেই টের পেয়েছিলেন পিরোজপুরের গৃহবধূ সালমা বেগম (ছদ্মনাম)। গোসলের সময় বুকে ছোট চাকা অনুভব করেন, কিন্তু লজ্জায় স্বামী বা পরিবারের কাউকে বলেননি। ভেবেছিলেন, এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে। যখন ব্যথা তীব্র হলো এবং চাকাটি বড় হয়ে ক্ষতের সৃষ্টি করল, তখন তিনি হাসপাতালে এলেন। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে; ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়েছে শরীরের অন্যান্য অংশেও। চিকিৎসকরা বলছেন, সালমার মতো হাজারো নারী কেবল সংকোচ আর অজ্ঞতার কারণে মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছে যাচ্ছেন।

বাংলাদেশে নারীদের ক্যান্সারজনিত মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ এখন স্তন ক্যান্সার। আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবোক্যানের সর্বশেষ তথ্যমতে, প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ১৩ হাজার নারী নতুন করে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং মারা যাচ্ছেন প্রায় ৭ হাজার। অথচ প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে এই রোগ শতভাগ নিরাময়যোগ্য।

ভয়াবহ চিত্র: আক্রান্ত হচ্ছেন তরুণীরাও
একসময় ধারণা করা হতো, পঞ্চাশোর্ধ্ব নারীদের স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বেশি। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট ভিন্ন। জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের তথ্যানুযায়ী, এখন ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সী নারীরাও উল্লেখযোগ্য হারে এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাত্রার পরিবর্তন, কায়িক শ্রমের অভাব এবং পরিবেশগত দূষণকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।

লজ্জাই যখন বড় শত্রু
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্তন ক্যান্সার চিকিৎসায় সবচেয়ে বড় বাধা ‘সামাজিক ট্যাবু’ বা লজ্জা। গ্রামের নারীরা তো বটেই, শহরের অনেক শিক্ষিত নারীও স্তনে কোনো অস্বাভাবিকতা দেখলে তা গোপন রাখেন। অনেকে পুরুষ ডাক্তারের কাছে যেতে চান না, আবার অনেকে মনে করেন এটি কোনো গোপন রোগ যা প্রকাশ করলে সামাজিকভাবে হেয় হতে হবে।

জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটের এপিডেমিওলজি বিভাগের প্রধান ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন বলেন, “আমাদের দেশে ৭০ শতাংশ রোগীই ডাক্তারের কাছে আসেন রোগের তৃতীয় বা চতুর্থ ধাপে। তখন আর করার তেমন কিছু থাকে না। অথচ প্রথম ধাপে আসলে ৯০ শতাংশেরও বেশি রোগী সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন। রোগীরা প্রথমে গ্রাম্য কবিরাজ বা হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা নিয়ে সময় নষ্ট করেন, যা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।”

সচেতনতার অভাব ও ভুল ধারণা
অনেকের ধারণা, স্তনে ব্যথা না থাকলে ভয়ের কিছু নেই। কিন্তু চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, স্তন ক্যান্সারের প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত কোনো ব্যথা থাকে না। ব্যথাহীন চাকা বা দলা অনুভব করাই এর প্রধান লক্ষণ। এই তথ্যটি না জানার কারণে নারীরা দিনের পর দিন নিশ্চিন্তে থাকেন, আর ভেতরে ভেতরে ক্যান্সার ডালপালা মেলতে থাকে।

তাছাড়া স্তন ক্যান্সার যে ছোঁয়াচে নয়, এ নিয়েও গ্রামের মানুষের মধ্যে ভুল ধারণা রয়েছে। ফলে আক্রান্ত নারীকে অনেক সময় পারিবারিকভাবে একঘরে করে রাখার মতো অমানবিক ঘটনাও ঘটে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নীরব ঘাতক রুখতে হলে লজ্জা ভেঙে কথা বলতে হবে। নিজের শরীর সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং সামান্য সন্দেহ হলেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ছাড়া মৃত্যুঝুঁকি কমানোর বিকল্প নেই।


 এক নজরে সতর্কতা

  • স্তনে বা বগলে কোনো চাকা বা দলা অনুভব করা।
  • স্তনের আকার বা আকৃতিতে পরিবর্তন।
  • নিপল বা বোঁটা দিয়ে রক্ত বা পুঁজ জাতীয় কিছু বের হওয়া।
  • স্তনের চামড়া কমলার খোসার মতো কুঁচকে যাওয়া।

পরামর্শ: ৩০ বছর বয়সের পর সব নারীর উচিত মাসে একবার নিজে নিজে স্তন পরীক্ষা (Self Examination) করা।