ইশতেহারে সমাধানের প্রত্যাশা
কামরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম: একসময় ‘বাংলাদেশের ওয়ালস্ট্রিট’ নামে পরিচিত, শত বছরের ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্য কেন্দ্র চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ আজ তার পুরনো জৌলুস হারিয়ে এক কঠিন সময় পার করছে। মসলা, ভোজ্যতেল, ডাল, চিনিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দেশের বৃহত্তম এই পাইকারি বাজারটি বর্তমানে নানা প্রতিকূলতায় জর্জরিত।
অসংখ্য ব্যবসায়ী নিজেদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ঋণখেলাপির বোঝা মাথায় নিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম করছেন। তারা কোনো অর্থ পাচারকারী নন, বরং নিতান্তই ব্যবসায়িক কারণে সৃষ্ট ক্ষতির শিকার।
দেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই সংকটাপন্ন ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে খাতুনগঞ্জের পুনরুজ্জীবন এবং সৎ ব্যবসায়ীদের উত্তরণের জন্য সুনির্দিষ্ট, বাস্তবসম্মত ও অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর পদক্ষেপের ঘোষণা থাকবে।
খাতুনগঞ্জের বর্তমান পরিস্থিতি: কেন এই সংকট?
একসময় চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য খালাস হয়ে সরাসরি খাতুনগঞ্জে আসত, যা এটিকে দেশের প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত করেছিল। কিন্তু গত কয়েক দশকে বিভিন্ন কারণে এর সেই একচেটিয়া আধিপত্য কমে এসেছে:
পরিবর্তিত আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থা: বর্তমানে অনেক বড় শিল্প গ্রুপ সরাসরি পণ্য আমদানি করে নিজস্ব সরবরাহ চেইন তৈরি করেছে। ফলে, খাতুনগঞ্জের ওপর তাদের নির্ভরশীলতা কমেছে।
ব্যাংকিং জটিলতা ও উচ্চ সুদের হার: ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ব্যাংক ঋণ প্রাপ্তিতে জটিলতা, উচ্চ সুদের হার এবং ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময়সীমা নিয়ে অনমনীয় মনোভাব অনেক সৎ ব্যবসায়ীকেও খেলাপি করে তুলেছে। পণ্যমূল্যের ওঠানামা, বিশ্ববাজারের অস্থিরতা এবং দেশীয় নীতির পরিবর্তনের কারণে অনেক সময় ব্যবসায়ীরা ক্ষতির সম্মুখীন হন, যা ঋণ পরিশোধে বিঘ্ন ঘটায়।
অবকাঠামোগত সমস্যা: অপর্যাপ্ত গুদামজাতকরণ ব্যবস্থা, যানজট, পণ্য পরিবহনে জটিলতা এবং আধুনিক প্রযুক্তির অভাব খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়িক সক্ষমতাকে দুর্বল করেছে।
নীতিগত সমর্থন ও সমন্বয়হীনতা: ব্যবসায়ীরা মনে করেন, সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এই ঐতিহ্যবাহী বাজারের জন্য দীর্ঘমেয়াদী কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা নীতিগত সমর্থন নেই। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বা সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে অনেক সময় দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব হয় না।
কর্পোরেট একচেটিয়া বাজার: বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রভাব ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য প্রতিযোগিতার পরিবেশ কঠিন করে তুলেছে।
ঋণখেলাপি ব্যবসায়ীদের আর্তনাদ: “আমরা পাচারকারী নই, ব্যবসায়ী!”
খাতুনগঞ্জের অনেক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তাদের অনেকেরই ঋণখেলাপি হওয়ার পেছনে কোনো অসৎ উদ্দেশ্য ছিল না। বিশ্ববাজারে পণ্যের দামের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি বা পতন, অপ্রত্যাশিত আমদানি শুল্ক পরিবর্তন, রাজনৈতিক অস্থিরতা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হওয়া – এসব কারণে তারা লোকসানে পড়েছেন। একজন ব্যবসায়ী বলেন, “আমরা তো দেশ ছেড়ে পালাইনি। ব্যবসা করে ঋণ পরিশোধ করতে চাই। কিন্তু ব্যাংক আমাদের সুযোগ দিচ্ছে না। সরকারের উচিত আমাদের মতো সৎ ব্যবসায়ীদের জন্য একটি বিশেষ ব্যবস্থা রাখা, যাতে আমরা আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারি।”
নির্বাচনী ইশতেহারে ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা:
আসন্ন নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের সুনির্দিষ্ট কিছু প্রত্যাশা রয়েছে:
১. বিশেষ প্রণোদনা ও ঋণ পুনর্গঠন: সৎ ও প্রকৃত ঋণখেলাপি ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ পুনর্গঠনের সুযোগ এবং নতুন করে ব্যবসায় বিনিয়োগের জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা।
২. ব্যাংকিং নীতি সংস্কার: সুদের হার কমানো, ঋণ প্রাপ্তি প্রক্রিয়া সহজ করা এবং ঋণের শর্তাবলীকে আরও নমনীয় করা।
৩. খাতুনগঞ্জ পুনরুজ্জীবন প্রকল্প: এই ঐতিহ্যবাহী বাজারকে আধুনিকীকরণের জন্য একটি সমন্বিত মাস্টার প্ল্যান তৈরি। এর মধ্যে গুদামজাতকরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন, যানজট নিরসন, পরিবহন সুবিধা বাড়ানো এবং ই-কমার্সের সুযোগ তৈরি করা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
৪. নীতিগত সমর্থন ও সুরক্ষা: ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য নীতিগত সমর্থন এবং স্থানীয় অর্থনীতির সুরক্ষায় বিশেষ পদক্ষেপ।
৫. নিরবচ্ছিন্ন পরিষেবা: নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, গ্যাস এবং ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করা, যা আধুনিক ব্যবসায়িক কার্যক্রমের জন্য অপরিহার্য।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে খাতুনগঞ্জের গুরুত্ব:
খাতুনগঞ্জ শুধু একটি বাজার নয়, এটি দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খলে এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। এর সংকট মানেই দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে সম্ভাব্য অস্থিরতা। খাতুনগঞ্জের পুনরুজ্জীবন দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, বাজার স্থিতিশীলতা এবং অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থানে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত হবে তাদের ইশতেহারে এই ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্য কেন্দ্রকে বাঁচানোর এবং এর ব্যবসায়ীদের ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সুস্পষ্ট ও কার্যকর পরিকল্পনা তুলে ধরা। এটি শুধু একটি অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের সমর্থন নিশ্চিত করবে না, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নেও সহায়ক হবে।
এ ধরণের আরও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট পেতে ভিজিট করুন www.businesstoday24.com










