শহিদুল হক, ঢাকা: ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির ঐতিহাসিক দরপতন দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার বাজার খোলার পর এক ডলারের বিপরীতে রুপির দাম নেমে আসে ৯১.০৭১-এ। এর মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো ৯১-এর ঘর অতিক্রম করল ভারতীয় মুদ্রা। দিনের শুরুতেই রুপি ৯০.৮৩ ছুঁয়ে রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছায় এবং লেনদেন শেষে তা ৯০.৭৮-এর আশপাশে স্থির হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, রুপির এই দরপতনের পেছনে একাধিক বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ কারণ কাজ করছে। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা, শেয়ার বাজার থেকে ধারাবাহিকভাবে বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাহার এবং শক্তিশালী ডলারের চাপ রুপিকে নজিরবিহীন দুর্বল অবস্থানে ঠেলে দিয়েছে। পাশাপাশি আমদানিকারকদের বাড়তি ডলার চাহিদাও রুপির ওপর চাপ আরও বাড়িয়েছে।
বিদেশি মুদ্রা লেনদেনকারীদের একাংশের আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী এক মাসের মধ্যেই ডলারের বিপরীতে রুপির দর ৯২ ছুঁয়ে ফেলাও অস্বাভাবিক হবে না। অর্থনীতিবিদদের মতে, রুপির পতন নতুন কিছু নয়, তবে পতনের গতি এবারে অপ্রত্যাশিতভাবে দ্রুত।
বাংলাদেশের জন্য কী সুবিধা হতে পারে
ভারতীয় রুপির এই দুর্বলতা বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
প্রথমত, আমদানি ব্যয়ে স্বস্তি। বাংলাদেশ ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি করে থাকে। খাদ্যশস্য, পেঁয়াজ, চাল, তুলা, সুতা, কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ এবং ওষুধসহ বিভিন্ন পণ্যের ক্ষেত্রে রুপি দুর্বল হলে তুলনামূলক কম দামে আমদানি করা সম্ভব হতে পারে। এতে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় কিছুটা কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, মূল্যস্ফীতির চাপ আংশিক কমতে পারে। ভারত থেকে আমদানিকৃত নিত্যপণ্যের দাম কমলে দেশের বাজারে খাদ্য ও ভোগ্যপণ্যের দামে স্বস্তি আসতে পারে। চলমান মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে এটি বাংলাদেশের জন্য একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তৃতীয়ত, সীমান্ত বাণিজ্য ও ছোট আকারের আমদানি বাড়ার সম্ভাবনা। রুপি দুর্বল হলে সীমান্ত এলাকার ব্যবসায়ীরা তুলনামূলক কম দামে ভারতীয় পণ্য সংগ্রহে আগ্রহী হতে পারেন। এতে সীমান্ত বাণিজ্য আরও সক্রিয় হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে রয়েছে চ্যালেঞ্জও
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতির নেতিবাচক দিকও রয়েছে। রুপি দুর্বল হলে বাংলাদেশি পণ্যের তুলনায় ভারতীয় পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারে। ফলে রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশের কিছু খাতে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, বিশেষ করে তৈরি পোশাক, কৃষিপণ্য ও হালকা প্রকৌশল পণ্যের ক্ষেত্রে।
এছাড়া ডলার শক্তিশালী হওয়ায় বাংলাদেশি টাকার ওপরও চাপ বাড়তে পারে। ফলে সামগ্রিকভাবে বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে অস্থিরতা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য সতর্কতার বার্তা দিচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির রেকর্ড দরপতন বাংলাদেশের জন্য স্বল্পমেয়াদে কিছু অর্থনৈতিক সুবিধা তৈরি করলেও দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। বিজনেসটুডে২৪ বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিকে কাজে লাগাতে হলে বাণিজ্য কৌশল ও মুদ্রানীতি আরও সতর্কভাবে সমন্বয় করা জরুরি।
এ ধরণের আরও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট পেতে ভিজিট করুন www.businesstoday24.com










