Home চট্টগ্রাম ভাইয়ের পথে ভাই: এক লড়াকু সাংবাদিকের গল্প

ভাইয়ের পথে ভাই: এক লড়াকু সাংবাদিকের গল্প

ম. শামসুল ইসলাম

মাহবুব হাসান, চট্টগ্রাম: 

একজন বড় ভাইয়ের কাছে তাঁর ছোট ভাই সব সময়ই স্নেহের আদরে ঢাকা থাকে। কিন্তু যখন সেই স্নেহের ছোট ভাইটি নিজের আদর্শ আর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সমাজে নিজের অবস্থান তৈরি করে নেয়, তখন ভাইয়ের চোখে স্নেহের পাশাপাশি ফুটে ওঠে এক গভীর গর্বের ছায়া। চট্টগ্রামের সাংবাদিক এবং দীর্ঘদিনের পেশাদার কলমযোদ্ধা মোহাম্মদ শামসুল ইসলাম (ম. শামসুল ইসলাম) এমনই একজন ব্যক্তিত্ব, যাঁর জীবন ও পেশা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে নীতি আর সংগ্রামের এক কঠিন সমীকরণে।
পেশার টানে, রক্তের টানে
আনোয়ারা উপজেলার সাগরতীরবর্তী রায়পুর গ্রাম। যেখানে এখন কেবল শূন্য ভিটেমাটি আর পুকুর-জমি পড়ে আছে। সেই মাটির সন্তান ম. শামসুল ইসলাম। অগ্রজ সাংবাদিকের হাত ধরে নয়, বরং অগ্রজকে দেখেই হয়তো সাংবাদিকতার নেশা রক্তে মিশেছিল তাঁর। যদিও অগ্রজ বারবার সতর্ক করেছিলেন—এই পেশায় সৎভাবে চলতে গেলে দুঃখ-বেদনার অন্ত নেই। কিন্তু আদর্শের পথে চলায় যার আনন্দ, তাকে কি আর অভাব বা কষ্টের ভয় দেখানো যায়?
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে উচ্চশিক্ষা শেষ করে জীবনের প্রথম পেশা হিসেবে বেছে নিলেন সাংবাদিকতাকেই।
সংগ্রাম ও বিরাগভাজন হওয়া
চট্টগ্রামের স্থানীয় দৈনিকে সাংবাদিকতার হাতেখড়ি হওয়া শামসুল ইসলাম শুরু থেকেই ছিলেন প্রতিবাদী। সাংবাদিকদের রুটি-রুজির সংগ্রামে তিনি ছিলেন সামনের সারির নেতা। চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের (সিইউজে) সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কয়েক দফায় দায়িত্ব পালন করেছেন, ছিলেন চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের নির্বাহী কমিটিতেও।
শ্রমজীবী সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ের লড়াকু এই নেতা বরাবরই মালিকপক্ষের বিরাগভাজন হয়েছেন, কিন্তু পিছু হটেননি। নিজের আখের গোছানোর পরিবর্তে সহকর্মীদের অধিকার রক্ষায় তিনি ছিলেন অকুতোভয়।
পথ পরিক্রমা: পাহাড় থেকে রাজধানী
পেশাগত জীবনে উত্থান-পতন কম আসেনি। শুরুর দিকে চট্টগ্রামে একটি দৈনিকে কাজ করতে গিয়ে হোঁচট খেয়েছিলেন প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায়। কিছুদিন বড় ভাইয়ের অগোচরেই মুন্সীগঞ্জের একটি সিমেন্ট কোম্পানিতে কাজ করেছেন। কিন্তু যার রক্তে সাংবাদিকতা, তাকে কি কর্পোরেট জগত বেঁধে রাখতে পারে?  তিনি পুনরায় ফিরে আসেন মূল ধারার সাংবাদিকতায়। রাজধানীভিত্তিক দৈনিক নয়া দিগন্তের চট্টগ্রাম অফিসে যোগদানের মাধ্যমে শুরু হয় তাঁর নতুন পথচলা। পরবর্তীতে চট্টগ্রামের একটি প্রভাবশালী দৈনিকের প্রধান প্রতিবেদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি ঢাকাভিত্তিক একটি জাতীয় দৈনিকের সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে চট্টগ্রামে দায়িত্বরত আছেন।
ব্যক্তিত্ব ও জীবনাচরণ
ম. শামসুল ইসলামের জীবন অত্যন্ত সাদাসিধে। দুই ছেলে-মেয়ে নিয়ে শহরের স্বল্প পরিসরের এক ভাড়া বাসায় তাঁর সংসার। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি যেমন সৎ, তেমনি কিছুটা মেজাজী। নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে তিনি আপসহীন। কারো ক্ষতি করা তাঁর স্বভাবে নেই, কিন্তু কেউ তাঁর ক্ষতি করতে চাইলে তিনি মুখ বুজে সয়ে নেওয়ার মানুষও নন। এই ‘মেজাজ’ মূলত তাঁর সততারই এক অন্য রূপ।
এক গর্বিত ভাইয়ের মূল্যায়ন
তাঁর অগ্রজ কামরুল ইসলাম, যিনি নিজে ঐতিহ্যবাহী ‘দৈনিক সংবাদ’-এর মাধ্যমে সাংবাদিকতা পেশায় , তিনি তাঁর অনুজ সম্পর্কে বলেন—

“সে আমার একমাত্র ভাই। আমি চেয়েছিলাম সে যেন এই কণ্টকাকীর্ণ পথে না আসে। কিন্তু সে শোনেনি। আজ যখন দেখি সে পেশাগত জীবনে অত্যন্ত সৎ এবং নিষ্ঠাবান, তখন মনে হয় আমার নিষেধের চেয়ে তাঁর জেদটাই সঠিক ছিল।”

ম. শামসুল ইসলাম কেবল একজন সাংবাদিক নন; তিনি বর্তমান সময়ের সাংবাদিকতা পেশার এক নিভৃতচারী পথিক। ভিটেমাটি আর পুকুর-জমির সেই গ্রামীণ শিকড় থেকে উঠে আসা এই কলমযোদ্ধা আজ চট্টগ্রামের সাংবাদিকতা অঙ্গনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।