ফরিদুল আলম, ঢাকা: দীর্ঘ কয়েক মাস উচ্চমূল্যের চাপে পিষ্ট হওয়ার পর অবশেষে ঢাকার কাঁচাবাজারে স্বস্তি ফিরিয়ে আনছে নতুন ‘মুড়িকাটা’ পেঁয়াজ। গত ডিসেম্বরের শুরুতে যে পেঁয়াজের দাম কেজিপ্রতি ১৩০-১৫০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল, আজ রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট ও শেওড়াপাড়া বাজারে সেই একই পেঁয়াজ মানভেদে ৬০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।
গত বছর শেষার্ধে পেঁয়াজের মজুত কমে যাওয়া এবং আমদানিতে কিছুটা ধীরগতির কারণে বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছিল। তবে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আগাম জাতের (মুড়িকাটা) পেঁয়াজ তোলা শুরু হলে বাজারে সরবরাহ বাড়তে থাকে। সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় গত তিন সপ্তাহে পেঁয়াজের দাম প্রায় ৫০% কমে এসেছে। মূলত দেশি নতুন পেঁয়াজের পর্যাপ্ত উপস্থিতিই আমদানিকৃত পেঁয়াজের ওপর চাপ কমিয়ে দামকে সহনীয় পর্যায়ে এনেছে।
বর্তমানে ঢাকার বাজারে আসা পেঁয়াজের সিংহভাগই আসছে দেশের প্রধান পেঁয়াজ উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলো থেকে:
পাবনা (সাঁথিয়া ও সুজানগর): দেশের সবচেয়ে বড় পেঁয়াজের যোগানদাতা।
রাজশাহী ও নাটোর: বিশেষ করে রাজশাহীর দুর্গাপুর ও নাটোর এলাকা থেকে প্রচুর মুড়িকাটা পেঁয়াজ আসছে।
কুষ্টিয়া (কুমারখালী): এখান থেকেও বড় একটি অংশ ঢাকার পাইকারি বাজারে ঢুকছে।
ফরিদপুর ও রাজবাড়ী: এসব অঞ্চল থেকেও মুড়িকাটা পেঁয়াজ সরবরাহ শুরু হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (DAE) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা গত বছরের তুলনায় বাড়ানো হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, শুধু রংপুর অঞ্চলেই এবার প্রায় ১ লাখ ৪৫ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা গত বছরের চেয়ে ২৫ হাজার টন বেশি। সারা দেশে এবার প্রায় ৩৮-৪০ লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে।
ঢাকায় পেঁয়াজ ৬০-৭০ টাকায় বিক্রি হলেও কৃষক পর্যায়ে চিত্রটি ভিন্ন:
কৃষকের বিক্রয় মূল্য: পাবনা ও রাজশাহীর স্থানীয় হাটগুলোতে (যেমন: বানেশ্বর হাট) কৃষকেরা বর্তমানে মণপ্রতি পেঁয়াজ ১৮০০ থেকে ২০০০ টাকায় বিক্রি করছেন। অর্থাৎ কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজির দাম পড়ছে প্রায় ৪৫-৫০ টাকা।
উৎপাদন খরচ: কৃষকদের মতে, এবার সার ও বীজের দাম বাড়ায় প্রতি কেজি পেঁয়াজ উৎপাদনে খরচ হয়েছে প্রায় ২৫-৩০ টাকা। ফলে বর্তমান দরে তারা কেজিতে ১৫-২০ টাকা লাভ করতে পারছেন। তবে কৃষকদের শঙ্কা, পুরোদমে পেঁয়াজ ওঠা শুরু হলে দাম যদি মণপ্রতি ১০০০ টাকার নিচে নেমে যায়, তবে তারা বড় লোকসানের মুখে পড়বেন।
দাম কি আরও কমবে?
বাজার বিশ্লেষক এবং আড়তদারদের মতে, দাম আরও কমার সম্ভাবনা উজ্জ্বল:
তীব্র শীতের প্রভাব: বর্তমানে তীব্র শৈত্যপ্রবাহের কারণে অনেক কৃষক ক্ষেত থেকে পেঁয়াজ কম তুলছেন। আবহাওয়া কিছুটা স্বাভাবিক হলে সরবরাহ আরও বাড়বে।
পুরো মৌসুমের অপেক্ষা: চলতি জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি থেকে ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে যখন হালি পেঁয়াজ (বড় দানার মূল পেঁয়াজ) বাজারে আসবে, তখন দাম আরও কমে ৪০-৫০ টাকার মধ্যে চলে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নতুন পেঁয়াজের সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় ভোক্তারা খুশি হলেও, তৃণমূলের কৃষকরা যেন ন্যায্যমূল্য পান সেদিকে সরকারের নজরদারি প্রয়োজন। মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে কৃষক ও ভোক্তার মধ্যকার মূল্যের পার্থক্য (বর্তমানে কেজিতে ১৫-২০ টাকা) কমিয়ে আনতে পারলে উভয় পক্ষই লাভবান হবে।










